ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘চুরি’র অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। বুধবার কারাকাসে একাধিক বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি চুক্তি স্বাক্ষরের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল দখল বা চুরি করছে না; বরং দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচে পড়ে থাকা সম্পদকে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনে আনার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ‘ভেনেজুয়েলার তেল চুরি করছে না’: মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী
ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘চুরি’র অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। বুধবার কারাকাসে একাধিক বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি চুক্তি স্বাক্ষরের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল দখল বা চুরি করছে না; বরং দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচে পড়ে থাকা সম্পদকে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনে আনার চেষ্টা করছে।
রাইটের বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে নতুন জ্বালানি সমঝোতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা তৈরি করেছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের একটি বড় অংশে নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নমূলক ভূমিকা পাবে। দেশটির কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে।
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ভেনেজুয়েলার তেল চুরি’ করার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর যুক্তি, তেলের মালিকানা ভেনেজুয়েলার জনগণের কাছেই থাকবে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো উৎপাদনের জন্য মূলধন ও প্রযুক্তি সরবরাহ করবে এবং রয়্যালটি ও কর থেকে পাওয়া অর্থ যাবে ভেনেজুয়েলার সরকার ও জনগণের কাছে।
চুক্তির ব্যাপ্তি কতটা
নতুন সমঝোতার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর ব্যাপকতা। যুক্তরাষ্ট্র ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি ভেনেজুয়েলীয় তেলের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ পেতে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এই পরিমাণ দেশটির মোট তেলসম্পদের প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি। ভেনেজুয়েলা আবার চুক্তি থেকে আগামী ২৫ বছরে প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে বলে হিসাব দিয়েছে।
এই পরিসংখ্যানই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন বলছে, বিশাল কিন্তু দীর্ঘদিনের অচল তেলসম্পদকে পুনরুজ্জীবিত করতে পুঁজি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। অন্যদিকে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, কোনো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের এত বড় অংশে বিদেশি পক্ষের নিয়ন্ত্রণকে কেবল বাণিজ্যিক সহযোগিতা হিসেবে দেখা যায় কি না।
এই দ্বৈত ব্যাখ্যাই বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
ওয়াশিংটনের যুক্তি
ক্রিস রাইটের বক্তব্যের মূল কাঠামোটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্র করে। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের বড় অংশ মাটির নিচে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। সেই সম্পদ উৎপাদনে আনতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ অবকাঠামো।
রাইট বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো অর্থ বিনিয়োগ করবে এবং তেল উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াবে। একই সঙ্গে সরকার রয়্যালটি ও কর পাবে। ফলে তাঁর দৃষ্টিতে এটি সম্পদ হস্তান্তরের চেয়ে অর্থনৈতিক পুনঃসক্রিয়করণের প্রকল্প।
এই যুক্তির আরেকটি স্তর হলো কর্মসংস্থান ও জনসেবার সম্ভাব্য উন্নতি। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজও বলেছেন, তেল উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান, মজুরি, হাসপাতাল, স্কুল ও খাদ্য সরবরাহে উন্নতি আনা সম্ভব হবে।
তেলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট
রাইট শুধু তেল উৎপাদনের কথা বলেননি। তিনি ভেনেজুয়েলার বিদ্যুৎ অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। তেল উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের জন্যও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। ফলে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনায় জ্বালানি খাত ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে পরস্পরনির্ভর দুটি স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের GE Vernova-ও ভেনেজুয়েলার ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ গ্রিড মেরামতে কাজ করবে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একই সময়ে Chevron এবং ইতালির Eni ভেনেজুয়েলায় নিজেদের তেল কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে।
উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল প্রতিদিন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা অনুযায়ী দশকের শেষ নাগাদ এই উৎপাদন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল প্রতিদিনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এটি ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দেশটির দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি উৎপাদনের তুলনায় এখনও কম।
উৎপাদন বৃদ্ধির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব তেলবাজারেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত সরবরাহ আন্তর্জাতিক বাজারে ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন শোধনাগারগুলোর জন্য ভারী অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ আরও সহজ হতে পারে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে সার্বভৌমত্ব
তবে অর্থনৈতিক যুক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রশ্নও প্রবল। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবর্তন ও তেলসম্পদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব একই কাঠামোর অংশ। নতুন চুক্তিকে কেউ কেউ শক্তিপ্রয়োগমূলক কূটনীতির সঙ্গে তুলনা করছেন।
অন্যদিকে রদ্রিগেজ প্রশাসন বলছে, দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য। তাদের বক্তব্য, তেল খাত পুনরুজ্জীবিত হলে রাষ্ট্রীয় আয় বাড়বে এবং সেই অর্থ সামাজিক সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে।
এখানে মূল প্রশ্নটি হলো মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের পার্থক্য। কোনো সম্পদের আইনি মালিকানা এক দেশের হাতে থাকলেও তার উৎপাদন, বিপণন ও রাজস্বপ্রবাহের ওপর অন্য পক্ষের উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ থাকলে বাস্তব অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য কোথায় দাঁড়ায়, সেটিই বিতর্কের বিষয়।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
ভেনেজুয়েলার তেল শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি ভূরাজনৈতিক প্রভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। দেশটির তেল রপ্তানির বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত পরিবর্তন সেই বাণিজ্যিক প্রবাহেও পরিবর্তন আনতে পারে।
ওয়াশিংটনের জন্য ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদে প্রবেশাধিকার জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাবের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে কারাকাসের জন্য এটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্য পথ।
তবে এই সমীকরণ কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর।
সামনে বড় পরীক্ষা
ক্রিস রাইটের বক্তব্য বিতর্ক থামানোর চেষ্টা করলেও প্রশ্নগুলো সহজে মুছে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই যদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করতে পারে এবং একই সঙ্গে দেশটির সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পায়, তাহলে চুক্তিটি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মডেল হিসেবে সামনে আসতে পারে।
কিন্তু বিপরীত পরিস্থিতিও সম্ভব। যদি রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় কিংবা বিদেশি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তীব্র হয়, তাহলে একই চুক্তি নতুন সংকটের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই ভেনেজুয়েলার তেল ঘিরে বর্তমান সমঝোতা শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। এটি অর্থনীতি, জ্বালানি, কূটনীতি ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বহুমাত্রিক পরীক্ষা। আগামী কয়েক বছরে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং জনগণের জীবনে এর বাস্তব প্রভাবই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগকে ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে।