ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ইতালিয়ান জায়ান্ট ইন্টার মিলানকে ২-১ গোলে হারিয়ে নতুন মৌসুমের মহাদেশীয় যাত্রায় শুভসূচনা করেছে স্প্যানিশ ক্লাবটি।
এমবাপ্পে-ভালভার্দের গোলে জয় দিয়ে শুরু রিয়াল মাদ্রিদের
ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ইতালিয়ান জায়ান্ট ইন্টার মিলানকে ২-১ গোলে হারিয়ে নতুন মৌসুমের মহাদেশীয় যাত্রায় শুভসূচনা করেছে স্প্যানিশ ক্লাবটি।
রিয়ালের জয়ে গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ফেদেরিকো ভালভার্দে। ইন্টারের হয়ে ব্যবধান কমিয়েছেন বদলি খেলোয়াড় কার্লোস অগুস্তো। তবে ম্যাচের শেষ দিকে ইন্টার সমতা ফেরানোর জন্য প্রবল চাপ তৈরি করলেও গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া একাধিক দুর্দান্ত সেভ করে রিয়ালের জয় নিশ্চিত করেন।
এই জয় রিয়ালের জন্য বিশেষ স্বস্তিরও। কারণ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচটির আগে স্প্যানিশ লিগে রিয়াল বেতিসের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল তারা। ফলে ঘরের মাঠে ইউরোপীয় মঞ্চে জয় পাওয়া ছিল আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুতেই এমবাপ্পের ঝলক
ম্যাচের শুরু থেকেই রিয়াল মাদ্রিদ বল দখলে রেখে আক্রমণ সাজানোর চেষ্টা করে। তবে প্রথম গোলটি আসে ইন্টার মিলানের একটি ভুল থেকে।
১৪ মিনিটে নিজেদের বিপদসীমার কাছে বলের নিয়ন্ত্রণ হারান ইন্টার ডিফেন্ডার ইয়ান বিসেক। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বল পেয়ে যান রিয়ালের ব্রাহিম দিয়াজ। তিনি দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে এমবাপ্পের দিকে পাস বাড়ান।
তারপর আর ভুল করেননি ফরাসি তারকা। ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে রিয়ালকে এগিয়ে দেন এমবাপ্পে।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এটি এমবাপ্পের ৭১তম গোল। এই গোলের মাধ্যমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে প্রতিযোগিতাটিতে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় কিংবদন্তি রাউলের সঙ্গে যৌথভাবে পঞ্চম স্থানে উঠে আসেন তিনি। মাত্র ১৪ মিনিটের গোলটি তাই শুধু ম্যাচের স্কোরলাইন বদলায়নি, এমবাপ্পের ব্যক্তিগত ইউরোপীয় পরিসংখ্যানেও নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।
ভালভার্দের গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ
প্রথম গোলের পর ইন্টার কিছুটা গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও আবারও নিজেদের ভুলের মাশুল দিতে হয় ইতালিয়ান দলটিকে।
২৩ মিনিটে বেনজামিন পাভারের ব্যাকপাস থেকে বল পান ইন্টার গোলরক্ষক জোসেপ মার্তিনেজ। কিন্তু রিয়ালের খেলোয়াড়েরা তখনই চাপ তৈরি করে রেখেছিলেন। দ্রুত এগিয়ে এসে মার্তিনেজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বল থেকে টোকা দিয়ে জালে পাঠান ফেদেরিকো ভালভার্দে।
মাত্র ২৩ মিনিটে ২-০।
রিয়ালের জন্য পরিস্থিতি তখন আদর্শ। কিন্তু ইন্টার মিলানকে একেবারে নিষ্ক্রিয় করে রাখা সম্ভব হয়নি। বরং দুই গোলের ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে আক্রমণের গতি বাড়াতে থাকে সফরকারী দল।
কোর্তোয়ার দৃঢ়তায় এগিয়ে রিয়াল
ইন্টার ম্যাচে ফেরার জন্য দূরপাল্লার শট ও দ্রুত আক্রমণের ওপর নির্ভর করতে থাকে। ৩৭ মিনিটে মার্কাস থুরামের দূরপাল্লার প্রচেষ্টা রুখে দেন কোর্তোয়া। বিরতির ঠিক আগে আবারও বড় পরীক্ষা দিতে হয় বেলজিয়ান গোলরক্ষককে।
লাউতারো মার্তিনেজের শটও ঠেকিয়ে দেন তিনি।
প্রথমার্ধে রিয়াল দুই গোল করলেও ইন্টার যে ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে যায়নি, কোর্তোয়ার কয়েকটি সেভই তার প্রমাণ। রিয়াল তাই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে তাদের সামনে ছিল চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের আবহ
বিরতির পর দুই দলই আক্রমণের গতি বাড়ায়। রিয়াল চেয়েছিল তৃতীয় গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে। অন্যদিকে ইন্টার মরিয়া ছিল ব্যবধান কমিয়ে লড়াইয়ে ফেরার জন্য।
তবে দুই প্রান্তের গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় বেশ কিছু আক্রমণ শেষ পর্যন্ত গোলের ঠিকানা খুঁজে পায়নি।
ম্যাচ যত শেষের দিকে এগোতে থাকে, উত্তেজনাও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ৭৭ মিনিটে ইন্টার তাদের কাঙ্ক্ষিত গোল পেয়ে যায়।
লাউতারো মার্তিনেজের কাটব্যাক থেকে বল পেয়ে জোরালো শটে গোল করেন কার্লোস অগুস্তো। ব্যবধান তখন ২-১।
হঠাৎ করেই ম্যাচের সমীকরণ বদলে যায়।
শেষ মুহূর্তে কোর্তোয়া
গোল পাওয়ার পর ইন্টার যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। রিয়ালের রক্ষণভাগের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। সমতা ফেরানোর জন্য একের পর এক আক্রমণ পরিচালনা করে ইতালিয়ান দলটি।
৮৪ মিনিটে আবারও কোর্তোয়ার দক্ষতার পরীক্ষা নেয় ইন্টার। মার্তিনেজের শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন তিনি। মাত্র পাঁচ মিনিট পর মিখিতারিয়ানের শটও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন রিয়ালের গোলরক্ষক।
শেষ কয়েক মিনিটে ইন্টার চাপ তৈরি করলেও রিয়ালের রক্ষণ আর ভাঙেনি। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে স্বাগতিকরা।
এমবাপ্পে-ভালভার্দে: আক্রমণের দুই ভিন্ন মাত্রা
এই ম্যাচে রিয়ালের দুই গোল এসেছে ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি থেকে। এমবাপ্পের গোল ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত, পজিশনিং ও ফিনিশিংয়ের সমন্বয়। অন্যদিকে ভালভার্দের গোল ছিল প্রতিপক্ষের ওপর উচ্চচাপ প্রয়োগের সুফল।
এখানেই রিয়ালের আক্রমণভাগের বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট হয়েছে। তারা শুধু নিখুঁত আক্রমণ গড়ে গোল করতে পারে না; প্রতিপক্ষের ছোট ভুলকেও মুহূর্তের মধ্যে বিপজ্জনক সুযোগে রূপান্তর করার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে।
এমবাপ্পের উপস্থিতি অবশ্য আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো বড় মঞ্চে গোল করার অভিজ্ঞতা ও চাপের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রিয়ালের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে।
হার থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা
রিয়াল বেতিসের কাছে হারের পর এই জয় নিঃসন্দেহে দলটির জন্য মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মৌসুমের শুরুতে দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক যাত্রায় ওঠানামা থাকবেই। কিন্তু বড় মঞ্চে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো একটি দলের চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলে।
ইন্টারের বিপক্ষে রিয়াল নিখুঁত ছিল না। শেষ দিকে তাদের রক্ষণকে যথেষ্ট চাপ সামলাতে হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কোর্তোয়ার সেভ, এমবাপ্পের গোল এবং ভালভার্দের কার্যকর ফিনিশিং শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়।
সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি কেবল শুরু। দীর্ঘ ইউরোপীয় অভিযানে রিয়ালকে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে। সেখানে শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়, দলগত ভারসাম্য, রক্ষণশৃঙ্খলা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও পরীক্ষা হবে।
ইন্টারের বিপক্ষে পাওয়া তিন পয়েন্ট তাই রিয়ালের জন্য শুধু একটি জয় নয়। এটি নতুন মৌসুমে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার প্রাথমিক বার্তা।
এমবাপ্পে গোল করেছেন। ভালভার্দে গোল করেছেন। আর শেষ প্রহরে কোর্তোয়া দুর্গ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
রিয়ালের ইউরোপীয় অভিযান শুরু হয়েছে জয়ে—তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও দীর্ঘ এবং কঠিন পথ।