লিওনেল মেসি যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) আকর্ষণ যে অনেকটাই বেড়েছে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে এবারের দলবদলে এক–দুজন নয়, ইউরোপ মাতানো তারকাদের যেন ঢল নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের লিগে। মৌসুমের দ্বিতীয় দলবদলের জানালা বন্ধ হতে এখনো তিন সপ্তাহ বাকি, এরই মধ্যে এমএলএসে পা রেখেছেন আঁতোয়ান গ্রিজমান, রবার্ট লেভানডফস্কি, আলেক্সিস সানচেজ ও কাসেমিরোর মতো তারকা।
লিওনেল মেসি যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) আকর্ষণ যে অনেকটাই বেড়েছে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে এবারের দলবদলে এক–দুজন নয়, ইউরোপ মাতানো তারকাদের যেন ঢল নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের লিগে। মৌসুমের দ্বিতীয় দলবদলের জানালা বন্ধ হতে এখনো তিন সপ্তাহ বাকি, এরই মধ্যে এমএলএসে পা রেখেছেন আঁতোয়ান গ্রিজমান, রবার্ট লেভানডফস্কি, আলেক্সিস সানচেজ ও কাসেমিরোর মতো তারকা।
নামের তালিকাটিই যেন এবারের দলবদলের অভিঘাত বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। বিশ্বকাপজয়ী ফরোয়ার্ড, ইউরোপের অন্যতম সেরা গোলস্কোরার, কোপা আমেরিকা জয়ী তারকা এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের একাধিকবারের বিজয়ী মিডফিল্ডার, সবাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ফুটবলের অংশ।
একসময় ইউরোপের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের জন্য এমএলএসকে বেছে নেওয়া হতো। এখন সেই ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তারকা ফুটবলারদের কাছে লিগটি ক্রমেই হয়ে উঠছে প্রতিযোগিতামূলক ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়, যেখানে অর্থনৈতিক আকর্ষণের পাশাপাশি আছে বর্ধিত বৈশ্বিক প্রচার ও ক্রমবর্ধমান দর্শক আগ্রহ।
গ্রিজমানের ঝলক
১৩ জুলাই অরল্যান্ডো সিটিতে যোগ দেন ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী ফরোয়ার্ড আঁতোয়ান গ্রিজমান। ২০১৬ ও ২০১৮ সালে ব্যালন ডি’অরে তৃতীয় হওয়া এই ফরোয়ার্ড নতুন দলের হয়ে অভিষেকেই নিজের জাত চিনিয়েছেন। সান হোসে আর্থকোয়েকসের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে গোল করেছেন তিনি। সেটি ছিল ক্লাব ফুটবলে তাঁর ক্যারিয়ারের ৩০০তম গোল।
গ্রিজমানের ক্যারিয়ার নিজেই একটি বিস্তৃত ফুটবল-আখ্যান। ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি তিনি ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ে বছরের পর বছর ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। অরল্যান্ডো সিটিতে তার আগমন তাই শুধু একটি নতুন চুক্তি নয়, এমএলএসের প্রতিযোগিতামূলক মর্যাদার জন্যও একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন।
অভিষেকেই গোল করাটা সেই আগ্রহকে আরও তীব্র করেছে।
লেভানডফস্কির গোলের ক্ষুধা
গ্রিজমানের আগেই এমএলএসে যোগ দেন রবার্ট লেভানডফস্কি। জুনের শেষ দিকে ৩৭ বছর বয়সী পোলিশ স্ট্রাইকার বার্সেলোনা ছেড়ে শিকাগো ফায়ারে যোগ দেন।
শিকাগোর হয়ে তৃতীয় ম্যাচেই শার্লটের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে দুটি গোল করেন তিনি। ইউরোপে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মৌসুমের পর মৌসুম গোলের পর গোল করেছেন লেভানডফস্কি।
২০১৯-২০ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের ঐতিহাসিক ছয় ট্রফি জয়ের অভিযানে তার অবদান ছিল অসামান্য। সেই মৌসুমে করেছিলেন ৫৫ গোল। করোনা মহামারির কারণে ব্যালন ডি’অর স্থগিত না হলে সেই পুরস্কারের সবচেয়ে বড় দাবিদারদের একজন ছিলেন তিনি।
বার্সেলোনায় শেষের আগের মৌসুমেও ৪২ গোল করেছিলেন। গত মৌসুম শেষ করেন ১৯ গোল দিয়ে।
এমএলএসে তার আগমন লিগের গোলস্কোরিং মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সানচেজ ও কাসেমিরো
গোল করা ও করানো, দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর আলেক্সিস সানচেজ। বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ইন্টার মিলানের মতো ক্লাবে খেলা চিলির এই তারকা দুই বছরের চুক্তিতে যোগ দিয়েছেন মন্ট্রিয়লে।
সানচেজের অভিজ্ঞতা এমএলএসের আক্রমণভাগে ভিন্ন ধরনের সৃজনশীলতা আনতে পারে। তার গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পাস দেওয়ার দক্ষতা এখনও প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বিপাকে ফেলতে সক্ষম।
তবে নামের ভারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজনগুলোর একটি নিঃসন্দেহে কাসেমিরো।
রিয়াল মাদ্রিদে ৯ বছর খেলে ক্লাব ফুটবলের প্রায় সব বড় শিরোপা জেতা ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার এবার লিওনেল মেসির সতীর্থ ইন্টার মায়ামিতে।
বিশ্বকাপেও ব্রাজিলের হয়ে খেলেছেন কাসেমিরো। ২০১১ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর ব্রাজিলের হয়ে ৯১ ম্যাচ খেলেছেন তিনি।
মায়ামির সঙ্গে তার চুক্তি আপাতত আগামী মৌসুমের শেষ পর্যন্ত। সময়সীমা ছোট হলেও তার অভিজ্ঞতা দলের মাঝমাঠে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বার্সেলোনার পুরোনো পরিচিতিও আসছেন
এবারের দলবদলে মেসির সঙ্গে বার্সেলোনায় খেলা সার্জি রবার্তোও এমএলএসে যোগ দিয়েছেন। তিনি নাম লিখিয়েছেন লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সিতে।
অন্যদিকে কলম্বাস ক্রুতে যোগ দিয়েছেন সাবেক ভিয়ারিয়াল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার এরিক বেইলি।
অর্থাৎ, শুধু এক বা দুইটি ক্লাব নয়, পুরো লিগজুড়েই ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার বিস্তার ঘটছে।
এমএলএসের সেরা দলবদল?
প্রশ্ন উঠতেই পারে, এটি কি এমএলএসের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দলবদলের জানালা?
গত বছরও বড় কয়েকজন তারকা এসেছিলেন। বায়ার্ন মিউনিখের জার্মান কিংবদন্তি টমাস মুলার যোগ দিয়েছিলেন ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসে। টটেনহাম ছেড়ে রেকর্ড ২ কোটি ৬৫ লাখ ডলারে লস অ্যাঞ্জেলেস এফসিতে গিয়েছিলেন সন হিউং-মিন।
এ বছরের শুরুতে মিনেসোটা ইউনাইটেডে যোগ দেন হামেস রদ্রিগেজও।
তারপরও এবারের তালিকায় গ্রিজমান, লেভানডফস্কি, সানচেজ ও কাসেমিরোর উপস্থিতি আলাদা মাত্রা তৈরি করেছে।
মেসির আগমনে বদলে যায় চিত্র
এমএলএসে বড় তারকার আগমন অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। ২০১৫ সালে আন্দ্রে পিরলো, ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, স্টিভেন জেরার্ড, কাকা ও দিদিয়ের দ্রগবার মতো তারকারা যুক্তরাষ্ট্রের লিগে এসেছিলেন।
কিন্তু ২০২৩ সালে লিওনেল মেসির ইন্টার মায়ামিতে যোগদান এমএলএসকে বৈশ্বিক ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
মেসির সঙ্গে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন সার্জিও বুসকেতস ও জর্দি আলবা। তাদের সমন্বয়ে ক্লাবটি নিজেদের ইতিহাসের প্রথম শিরোপা জেতে। এরপর মায়ামি ঘিরে তৈরি হয় আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক আগ্রহ।
মেসির প্রভাব শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার উপস্থিতি এমএলএসের বাণিজ্যিক আবেদন, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার এবং বিশ্বজুড়ে দর্শকের আগ্রহকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
সামনে আরও চমক?
এবারের দলবদলের জানালা বন্ধ হবে ২ সেপ্টেম্বর। তাই গল্পের শেষ এখনও হয়নি।
গ্রিজমান, লেভানডফস্কি, সানচেজ ও কাসেমিরোর পর আরও কোনো ইউরোপজয়ী তারকার নাম এমএলএসের তালিকায় যুক্ত হয় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহল।
একসময় যাকে ইউরোপের বাইরে অবসরকালীন ফুটবলের ঠিকানা হিসেবে দেখা হতো, সেই এমএলএস এখন ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় বদলাচ্ছে। মেসি সেই রূপান্তরের সবচেয়ে উজ্জ্বল অনুঘটক ছিলেন।
এবার তার পথ ধরে তারকারা আসছেন একের পর এক।