শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবরযুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করল ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ও বিস্তৃত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইরান। ওয়াশিংটন তেহরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও সংকুচিত করতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির অবকাঠামো বা স্বার্থ হুমকির মুখে পড়লে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।

TTaaraaz24bd২৫ Aug ২০২৬, ০৫:৪৮ AM0 পাঠক0 মন্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করল ইরান
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

 যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ও বিস্তৃত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইরান। ওয়াশিংটন তেহরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও সংকুচিত করতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির অবকাঠামো বা স্বার্থ হুমকির মুখে পড়লে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সোমবার নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। এর আওতায় প্রায় ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজকে লক্ষ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা দেশগুলোকে মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে ওয়াশিংটন। 

Inside Artcle

তেহরানের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর। ইরানের অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিজাদেহ বলেছেন, দেশটি নতুন নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রস্তুত এবং মার্কিন চাপ মোকাবিলায় নিজেদের হাতিয়ার রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের এক মুখপাত্র সতর্ক করেছেন, ইরানের অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়াল ওয়াশিংটন

নতুন মার্কিন পদক্ষেপকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অর্থনৈতিক চাপের আরও বিস্তৃত রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ইরানের রাজস্বের উৎস সংকুচিত করা এবং দেশটির আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক যোগাযোগকে আরও কঠিন করে তোলা।

মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, নতুন পদক্ষেপের আওতায় ইরানের সামরিক কার্যক্রম, সাইবার তৎপরতা এবং তেলবাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই উদ্যোগকে ‘Operation Economic Outcast’ নামে অভিহিত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু ইরানের ওপর সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও মার্কিন চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে একটি জটিল আর্থিক বলয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরানের পাল্টা হুমকি

তেহরান দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখে আসছে। নতুন পদক্ষেপের পর ইরানের বক্তব্যে সেই অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে।

ইরানের অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিজাদেহ বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় তেহরান প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকবে না, বরং প্রয়োজন হলে পাল্টা পদক্ষেপও নিতে পারে। 

ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো যদি নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে।

এ ধরনের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ইতোমধ্যে অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে এই জলপথের গুরুত্ব অপরিসীম।

ইরানের কর্মকর্তারা অতীতেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি পরিবহন নিয়ে পাল্টা পদক্ষেপ বিবেচনা করা হতে পারে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেও এই জলপথে নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে এখানে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণেই ইরানের পাল্টা বক্তব্যকে ওয়াশিংটন ও অন্যান্য রাজধানী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান বলছে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদাররা মার্কিন চাপ মেনে নেবে না।

চীন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি লক্ষ্য করা হয়নি। 

ওয়াশিংটনও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক। কারণ চীনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক ব্যবস্থা নিলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কেও তার প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। 

অন্যদিকে রাশিয়াও মার্কিন চাপের বিরোধিতা করেছে। ফলে ইরানকে ঘিরে নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠছে।

অর্থনীতির ওপর চাপ

ইরানের অর্থনীতি বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সীমাবদ্ধতার চাপে রয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই চাপকে আরও তীব্র করতে পারে।

বিশেষ করে তেল রপ্তানি, পরিবহন, প্রযুক্তি, বিমান চলাচল এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত খাতে নতুন বাধা তৈরি হলে ইরানের ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। 

অন্যদিকে ইরানও দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিকল্প বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। দেশটির কর্মকর্তারা সেই অভিজ্ঞতাকেই এখন প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।

তবে নিষেধাজ্ঞা যত বিস্তৃত হয়, বিকল্প ব্যবস্থার ওপর চাপও তত বাড়ে। এখানেই তেহরানের জন্য বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা।

কূটনীতির সম্ভাবনা কি কমছে?

নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাও চলছিল। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সম্প্রতি তেহরান সফর করেছেন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাকিস্তান এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টায় ভূমিকা রেখেছিল। 

ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপ ও বলপ্রয়োগের পরিবর্তে কূটনৈতিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং পাল্টা হুমকি আলোচনার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে। 

এখানে দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট। একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে মধ্যস্থতার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দাম কমেছে। তবে বাজারের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।

কারণ বাজারে শুধু বর্তমান সরবরাহ নয়, ভবিষ্যৎ ঝুঁকিও মূল্যায়িত হয়। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।

এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সামনে কী?

নতুন নিষেধাজ্ঞার পর ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া কতটা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তেহরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ওয়াশিংটনও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।

তবে সংঘাতের এই পর্যায়ে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক যুদ্ধও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট হয়ে উঠেছে।

ইরানের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক চাপ সামলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এমন চাপ প্রয়োগ করা, যাতে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে, কিন্তু বৈশ্বিক বাজার ও মিত্রদের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত অভিঘাত সীমিত থাকে।

এই টানাপোড়েনের ফল নির্ভর করবে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অবস্থান এবং উভয় পক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইরান, আর সেই প্রতিক্রিয়ার পরিধি কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

sticky add
Popup