শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবরমধ্যপ্রাচ্য

ইরাক থেকে সৌদির তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন করে জটিল মোড় নিয়েছে। ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত একাধিক ড্রোন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন-এ হামলা চালানোর পর রিয়াদ সাময়িকভাবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

TTaaraaz24bd১২ Sep ২০২৬, ০৬:০১ AM2 পাঠক0 মন্তব্য
ইরাক থেকে সৌদির তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

ইরাক থেকে সৌদির তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা

 মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন করে জটিল মোড় নিয়েছে। ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত একাধিক ড্রোন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন-এ হামলা চালানোর পর রিয়াদ সাময়িকভাবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানবু পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটির কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাইপলাইনটি প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

Inside Artcle

হামলার পর পাইপলাইন বন্ধ

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পাইপলাইনের বিভিন্ন অংশ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের কাজ চলছে।

স্যাটেলাইট ছবিতেও মদিনার দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি অংশের কাছে কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। তবে ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা এবং রপ্তানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামতের কাজ চলছে।

সৌদির অভিযোগ, ড্রোন এসেছে ইরাক থেকে

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ইরাক থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। রিয়াদ এ ঘটনাকে দেশটির সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে দেখছে।

তবে সৌদি আরব তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়ার পথে যায়নি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সৌদি নেতৃত্বের কাছে বাগদাদকে হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধের পর রিয়াদ আপাতত প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি সরকার স্পষ্ট করেছে, নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে।

এই সংযত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সরাসরি পাল্টা হামলা হলে ইরাক-সৌদি সম্পর্কের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতও আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরাকের তদন্ত ও সামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত

বাগদাদও হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তের পর ইরাকের মায়সান প্রদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একজন সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে।

মায়সান প্রদেশ ইরাকের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং ইরানের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকা। অঞ্চলটিতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব দীর্ঘদিনের বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে হামলার জন্য দায়ী করার ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি।

ইরাকের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাগদাদ একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে নিজের ভূখণ্ডকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

কেন ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, যাকে পেট্রোলাইন নামেও অভিহিত করা হয়, দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেলকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে দেয়।

এর সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা হলো—এই পথ ব্যবহার করে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে কিছু তেল রপ্তানি করতে পারে। বর্তমান সংঘাতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে অবনতির ফলে বিকল্প রপ্তানি করিডর হিসেবে পাইপলাইনটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

অতএব, পাইপলাইনে হামলা কেবল একটি অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, সৌদি রপ্তানি সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক বাজারের আস্থার প্রশ্ন।

বৈশ্বিক তেলবাজারে নতুন উদ্বেগ

হামলার খবর প্রকাশের আগেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯ সেপ্টেম্বর ১০১ ডলার ২১ সেন্টে স্থির হয়। হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংকট বাজারে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

এখন সৌদির গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থাও হামলার শিকার হওয়ায় বাজারের উদ্বেগ আরও তীব্র হতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার জ্বালানি বাজারেও তার অভিঘাত পৌঁছাতে পারে।

বিশেষ করে সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক হওয়ায় দেশটির উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামোর ওপর যেকোনো বড় ধরনের চাপ আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

একই সময়ে লোহিত সাগরেও উত্তেজনা

পাইপলাইনে হামলার সঙ্গে একই সময়ে ইয়েমেনের হুথিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালির কৌশলগত দ্বীপ পেরিম বা মায়ুনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে ইয়েমেনি সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে। বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ।

এই দুই ঘটনা একসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি করছে। একদিকে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা, অন্যদিকে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট। এর মধ্যে সৌদির পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।

সৌদির সামনে কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণ

রিয়াদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—কীভাবে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রেখে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত হওয়া থেকে ঠেকানো যায়। তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়া হয়তো হামলার জবাব দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন সংঘাতের দ্বারও খুলে দিতে পারে।

এই কারণেই সৌদি আরব আপাতত ইরাকের তদন্তের ওপর আস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে রিয়াদের সতর্কবার্তাও স্পষ্ট: ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলা হলে প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন মাত্রা

ইরাক থেকে সৌদি তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক পরিধিকে আরও দৃশ্যমান করেছে। এটি শুধু সৌদি আরব ও ইরাকের মধ্যকার নিরাপত্তা সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী, হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের নিরাপত্তা।

পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, জ্বালানি অবকাঠামো এখন ক্রমেই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপসৃষ্টিকারী উপাদানে পরিণত হচ্ছে। সৌদি আরবের জন্য তাই পাইপলাইন পুনরায় চালু করার চেয়ে বড় কাজ হতে পারে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বর্তমানে তদন্ত চলছে। হামলার নেপথ্যে কারা ছিল এবং তাদের সঙ্গে কোন সশস্ত্র নেটওয়ার্কের যোগসূত্র রয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া সময়সাপেক্ষ। কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি করিডরগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, আর তার প্রতিটি অভিঘাত বিশ্ব তেলবাজারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

Sticky
Popup