শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবরমধ্যপ্রাচ্য

গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে

গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে—যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাতে সেখানকার মানুষের জীবনে তৈরি হওয়া এক গভীর মানবিক সংকটের চিত্র সামনে এনেছে এই ঘটনা। যুদ্ধ শুধু ঘরবাড়ি, হাসপাতাল কিংবা অবকাঠামো ধ্বংস করছে না; স্বজন হারানোর পর তাঁদের যথাযথভাবে সমাহিত করার মৌলিক সুযোগটুকুও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

TTaaraaz24bd২৪ Aug ২০২৬, ১১:৩৮ AM2 পাঠক0 মন্তব্য
গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে

গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে—যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাতে সেখানকার মানুষের জীবনে তৈরি হওয়া এক গভীর মানবিক সংকটের চিত্র সামনে এনেছে এই ঘটনা। যুদ্ধ শুধু ঘরবাড়ি, হাসপাতাল কিংবা অবকাঠামো ধ্বংস করছে না; স্বজন হারানোর পর তাঁদের যথাযথভাবে সমাহিত করার মৌলিক সুযোগটুকুও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহির পরিবারের এমন অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ, ৪০, গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় একটি ছোট চা-কফির দোকানে কাজ করতেন। ১০ জুন তিনি নিহত হন। বাবাকে দাফন করতে ওমর জেইতুন কবরস্থানে গেলে সেখানে নতুন কবরের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা খুঁজে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের পুরোনো কবরেই বাবাকে দাফন করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। 

Inside Artcle

ঘটনাটি ব্যক্তিগত শোকের সীমা ছাড়িয়ে গাজার বৃহত্তর মানবিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

কবরস্থানে জায়গার সংকট

যুদ্ধের কারণে গাজার বিভিন্ন কবরস্থানে মৃতের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। বহু জায়গায় কবরগুলো এত ঘন হয়ে গেছে যে নতুন করে সমাহিত করার জন্য জায়গা বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক কবরও স্বাভাবিকভাবে নির্মাণ বা চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও শুধু একটি পাথর কিংবা কাগজে মৃত ব্যক্তির নাম লিখে পরিচয় সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। 

ওমরের অভিজ্ঞতাও ছিল এমনই। তিনি বাবাকে দাফনের জন্য কবরস্থানটিতে গিয়ে দেখেন, আগের কবরগুলোর মাঝখানে নতুন কবরের জায়গা প্রায় নেই। যুদ্ধের কারণে স্বাভাবিক কবর খনন ও প্রস্তুতের ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়েছে।

একটি পরিবারের জন্য এই পরিস্থিতি কতটা বেদনাদায়ক, তা সহজে পরিমাপ করা যায় না। প্রিয়জনকে হারানোর পর মানুষ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থানে তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে চায়। সেই জায়গাটুকুও যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় অসহায়ত্ব।

দাদার কবরে বাবাকে দাফন

ওমরের পরিবারের সামনে শেষ পর্যন্ত দুটি বড় সমস্যা দাঁড়ায়। একদিকে নতুন কবরের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। অন্যদিকে কবর প্রস্তুতের ব্যয়ও পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে ছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় একটি কবর প্রস্তুত করতে প্রায় ৫০০ শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ১৬৭ মার্কিন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক দুর্দশায় থাকা অনেক পরিবারের জন্য এই ব্যয়ও বড় বোঝা। 

ফলে ওমর ও তাঁর পরিবার বাবাকে দাদার কবরে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেন।

এই সিদ্ধান্তের মধ্যে যেমন রয়েছে গভীর পারিবারিক সম্পর্ক, তেমনি রয়েছে যুদ্ধকালীন বাস্তবতার নির্মমতা। যে কবর একসময় পরিবারের একজন প্রবীণের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেটিই পরিণত হলো পরবর্তী প্রজন্মের একজনের শেষ ঠিকানায়।

যুদ্ধের মধ্যে দাফনও হয়ে উঠেছে সংকট

গাজায় দীর্ঘ সংঘাতের ফলে শুধু কবরস্থানের জায়গাই সংকুচিত হয়নি। মৃতদের শনাক্তকরণ, মরদেহ উদ্ধার এবং যথাযথভাবে দাফনের প্রক্রিয়াও নানা বাধার মুখে পড়েছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সময়ে বহু মানুষকে বাগান, তাঁবু, বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল, স্কুল কিংবা হাসপাতালের আশপাশের অস্থায়ী স্থানে দাফন করা হয়েছে। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপ কিংবা অস্থায়ী সমাধিস্থল থেকে স্বজনদের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। 

এটি একটি অস্বাভাবিক বাস্তবতা। সাধারণ সময়ে দাফন একটি সামাজিক, ধর্মীয় এবং পারিবারিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকেও জরুরি ব্যবস্থাপনায় পরিণত করে।

কবর শুধু একটি জায়গা নয়

একটি কবরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল মৃত্যুর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে প্রিয়জনকে স্মরণ করেন। কথা বলেন। প্রার্থনা করেন। পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে জায়গাটি ধীরে ধীরে জড়িয়ে যায়।

তাই কবরস্থানের সংকটের অর্থ শুধু জায়গার অভাব নয়। এর অর্থ হলো স্মৃতি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসরও সংকুচিত হয়ে যাওয়া।

গাজায় এর প্রভাব আরও গভীর। যুদ্ধের কারণে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। বহু পরিচিত রাস্তা, পাড়া ও সামাজিক স্থাপনা বদলে গেছে। এর মধ্যে কবরস্থানও যদি অচেনা হয়ে যায় কিংবা সেখানে নতুন কবরের জায়গা না থাকে, তাহলে মানুষের স্মৃতির ভূগোলও বদলে যায়।

অস্থায়ী সমাধিস্থল থেকে স্থায়ী কবরের সন্ধান

যুদ্ধের তীব্র পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ধ্বংসস্তূপের কারণে অনেক মরদেহ তাৎক্ষণিকভাবে প্রচলিত কবরস্থানে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে বিভিন্ন অস্থায়ী স্থানে দাফন করা হয়েছে। পরে পরিবারগুলো সুযোগ পেলে স্বজনদের আরও উপযুক্ত স্থানে সমাহিত করার চেষ্টা করেছে।

এই প্রক্রিয়ায় শুধু শোক নয়, প্রশাসনিক ও বাস্তব সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। মরদেহ শনাক্ত করা, স্থানান্তর করা এবং কবরের নথি সংরক্ষণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ যখন দীর্ঘায়িত হয়, তখন এমন সংকটও ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে।

মৃতদের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে যুদ্ধের সময় মৃতদের মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে এই নীতির প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়ে যখন হাসপাতাল, পৌরসেবা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং কবরস্থানসহ নাগরিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গাজার বিভিন্ন কবরস্থান নিয়েও অতীতে ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসের খবর এসেছে। এসব ঘটনা মৃতদের স্বজনদের জন্য নতুন করে মানসিক আঘাত তৈরি করেছে। 

একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবার অন্তত একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক সমাধিস্থল প্রত্যাশা করে। যুদ্ধ সেই মৌলিক প্রত্যাশাকেও যখন অনিশ্চিত করে তোলে, তখন সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একটি পরিবারের গল্প, বৃহত্তর সংকটের প্রতীক

ওমরের বাবাকে দাদার কবরে দাফনের ঘটনা একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বেদনার গল্প। কিন্তু এর মধ্যেই গাজার বৃহত্তর মানবিক পরিস্থিতির বহু স্তর দৃশ্যমান।

এখানে রয়েছে প্রাণহানি। রয়েছে কবরস্থানের সংকট। রয়েছে অর্থনৈতিক দুর্দশা। রয়েছে নাগরিক পরিষেবার বিপর্যয়। এবং রয়েছে স্বজনের স্মৃতি ধরে রাখার সংগ্রাম।

একটি পরিবার নতুন কবরের জায়গা না পেয়ে পুরোনো কবর ব্যবহার করেছে। কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনাটিই দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধের অভিঘাত মানুষের জীবনের কত গভীরে পৌঁছাতে পারে।

বাড়ি হারানো, জীবিকা হারানো কিংবা নিরাপদ আশ্রয় হারানোর পাশাপাশি মানুষ কখনো কখনো হারিয়ে ফেলছে প্রিয়জনকে শেষবারের মতো যথাযথভাবে বিদায় জানানোর সুযোগও।

শেষ বিদায়ের জায়গাটুকুও যখন অনিশ্চিত

গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে কবরস্থানের সংকট যুদ্ধের আরেকটি কম আলোচিত মানবিক মাত্রা সামনে এনেছে। মৃতদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাধিস্থলের প্রয়োজনও বাড়ছে। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে নতুন কবরের জন্য জায়গা, অর্থ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো—সবকিছুরই ঘাটতি রয়েছে।

ওমরের পরিবারের সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি পারিবারিক ব্যবস্থা নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে যুদ্ধ মানুষের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করছে।

জীবিতদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি মৃতদের জন্যও সম্মানজনক শেষ ঠিকানার সংকট তৈরি হয়েছে।

দাদার কবরে বাবাকে দাফন করা সেই বাস্তবতারই এক নীরব, কিন্তু গভীর প্রতিচ্ছবি।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

sticky add
Popup
গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে | তারাজ২৪