কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৬০ কোটি ডলার। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জানিয়েছেন, ৭ দশমিক ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কলম্বিয়ান পেসো, যা আনুমানিক ৯ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। তবে এই হিসাব এখনো প্রাথমিক এবং উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন কার্যক্রম এগিয়ে গেলে তা পরিবর্তিত হতে পারে।
কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৬০ কোটি ডলার। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জানিয়েছেন, ৭ দশমিক ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কলম্বিয়ান পেসো, যা আনুমানিক ৯ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। তবে এই হিসাব এখনো প্রাথমিক এবং উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন কার্যক্রম এগিয়ে গেলে তা পরিবর্তিত হতে পারে।
১০ আগস্ট পশ্চিম কলম্বিয়ায় আঘাত হানা ভূমিকম্পটি দেশটির চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০৭ থেকে ১১০ কিলোমিটার। এর প্রভাবে কালি, পেরেইরা, কুইবদো, আরমেনিয়া ও মানিজালেসসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির চিত্র
প্রেসিডেন্টের দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মোট ক্ষতির মধ্যে প্রায় ২৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন পেসো এসেছে ভবন ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষতি থেকে। অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন পেসো। অর্থাৎ দুর্যোগটির অভিঘাত শুধু আবাসিক ভবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্যায়ন সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ করা যায় না। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উৎপাদন কার্যক্রমের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসাব করতে সময় প্রয়োজন। ফলে ৯৬০ কোটি ডলারের বর্তমান হিসাবকে চূড়ান্ত অঙ্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতা
অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি ভূমিকম্পে প্রাণহানির ঘটনাও ব্যাপক। সর্বশেষ প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২৮০ জন নিহত হয়েছেন, ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং ১৪৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে উদ্ধারকাজ ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন বা বসবাসের জন্য অনিরাপদ স্থাপনার মুখোমুখি হয়েছেন। এপি জানিয়েছে, ১২ হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। ফলে জরুরি আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ পানি সরবরাহ এখন পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পশ্চিমাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধাক্কা
ভূমিকম্পের আরেকটি বড় অভিঘাত পড়েছে পরিবহন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের ওপর। বিশেষ করে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কফি সরবরাহ ও রপ্তানি ব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পটি কফি সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রায় ৬০ শতাংশের ওপর প্রভাব ফেলেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় বন্দর বুয়েনাভেনতুরার কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।
কলম্বিয়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কফি উৎপাদক। তাই এই বিপর্যয়ের প্রভাব দেশের সীমান্তের বাইরেও অনুভূত হতে পারে। সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে কৃষক, পরিবহন ব্যবসা, রপ্তানিকারক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা—সব পক্ষকেই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হতে পারে।
পুনর্গঠন হবে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পুনর্নির্মাণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নগর পরিকল্পনা, ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন।
বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে কলম্বিয়ার ভূমিকম্প মোকাবিলায় ২০ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, অর্থটি জরুরি প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারে ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক লোকসান মূল্যায়নের জন্য Global Rapid Assessment of Damages from Earthquakes বা GRADE কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সঠিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ছাড়া পুনর্গঠনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা কঠিন। কোথায় আগে হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ করতে হবে, কোন সড়ক দ্রুত সচল করা জরুরি, কোন পরিবারকে সরাসরি সহায়তা প্রয়োজন এবং কোন ব্যবসায়িক খাতকে পুনরায় চালু করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত নির্ভর করে নির্ভুল তথ্যের ওপর।
ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে প্রস্তুতির প্রশ্ন
কলম্বিয়া ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটির ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি দীর্ঘদিনের। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এর জন্য ভূমিকম্প সহনশীলতা, প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতায় বিনিয়োগ জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে শক্তিশালী বিধিমালা, সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শনাক্তকরণ ভূমিকম্পের ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি থাকলে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
অর্থনীতির ওপর দীর্ঘ ছায়া
৯৬০ কোটি ডলারের প্রাথমিক ক্ষতির হিসাব কলম্বিয়ার অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর ধাক্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরাসরি স্থাপনা ও অবকাঠামোর ক্ষতির বাইরে রয়েছে উৎপাদন বন্ধ থাকা, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিঘ্ন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আয় হারানোর মতো পরোক্ষ ক্ষতি।
বিশেষ করে কফি উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থায় বিঘ্ন দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব কৃষি অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। ভূমিকম্পের অভিঘাত তাই শুধু ধ্বংসস্তূপে দৃশ্যমান নয়; এর একটি অংশ অর্থনীতির অদৃশ্য স্তরেও বিস্তৃত।
পুনরুদ্ধারের পথে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা
কলম্বিয়ার সরকার এই দুর্যোগকে বড় জাতীয় সংকট হিসেবে দেখছে। প্রেসিডেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং সরকারি প্রচেষ্টাকে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে কেন্দ্রীভূত করার কথা বলেছেন।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও ঝুঁকিসচেতন।
কলম্বিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আবারও দেখিয়ে দিল, একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মানবিক বিপর্যয়কে অর্থনৈতিক সংকটে রূপ দিতে পারে। প্রায় ৯৬০ কোটি ডলারের প্রাথমিক ক্ষতির অঙ্ক সেই অভিঘাতের আর্থিক প্রতিচ্ছবি মাত্র। প্রকৃত ক্ষতির পূর্ণ চিত্র আরও পরে স্পষ্ট হবে।
তবে পুনর্গঠনের সুযোগও রয়েছে। যদি নতুন অবকাঠামো আরও ভূমিকম্প সহনশীল হয়, দুর্যোগ প্রস্তুতি শক্তিশালী করা যায় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রাখা হয়, তাহলে এই বিপর্যয় থেকে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।