ফ্রান্স-ইরাক ম্যাচে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে দুই ঘণ্টার বেশি সময় খেলা বন্ধ ছিল। সেই সময়ে ড্রেসিংরুমে কী করেছিলেন এমবাপ্পে, দেশম্পস ও ইরাক দল? বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানুন।
দুই ঘণ্টার আবহাওয়া বিরতিতে কী করেছিল ফ্রান্স ও ইরাক? ‘মানসিকভাবে ক্লান্তিকর’ অভিজ্ঞতার গল্প
ফিলাডেলফিয়া, ২৩ জুন ২০২৬: বিশ্বকাপের ম্যাচে সাধারণত খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা। কিন্তু ফ্রান্স ও ইরাকের মধ্যকার ম্যাচে প্রতিপক্ষের পাশাপাশি তাদের লড়তে হয়েছে প্রকৃতির সঙ্গেও। প্রবল বৃষ্টি, বজ্রপাতের আশঙ্কা এবং দুই ঘণ্টারও বেশি সময়ের খেলা বন্ধ থাকায় ম্যাচটি পরিণত হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতায়।
ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় শুরু হলেও শেষ হতে রাত প্রায় ৮টা ৪৭ মিনিট বেজে যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর আগে প্রায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় খেলা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় আয়োজকরা।
অবশেষে বিরতির পর মাঠে ফিরে আরও দুটি গোল করে ৩-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ফ্রান্স। অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের ১০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে জোড়া গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন এবং ফ্রান্সকে নকআউট পর্বে পৌঁছে দেন।
কী ঘটেছিল ফিলাডেলফিয়ায়?
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার সময়ই আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করে। ফ্রান্স তখন ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। রেফারি বিরতির বাঁশি বাজানোর পরপরই শুরু হয় ভারী বৃষ্টি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বজ্রপাত ও ঝড়ের আশঙ্কা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিমালা অনুসারে ম্যাচ স্থগিত করা হয়।
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা NOAA-এর নির্দেশনা অনুযায়ী স্টেডিয়ামের আট মাইলের মধ্যে বজ্রপাত শনাক্ত হলে খেলা বন্ধ রাখতে হয়। ফিফাও স্থানীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে বাধ্য।
ফলে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতে রাত ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
ড্রেসিংরুমে কী করছিলেন এমবাপ্পেরা?
দীর্ঘ বিরতির সময় খেলোয়াড়দের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা।
ম্যাচ শেষে কিলিয়ান এমবাপ্পে বলেন,
"এটি ছিল খুব দীর্ঘ একটি সন্ধ্যা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। মানসিক ও আবেগগতভাবে এটি অত্যন্ত ক্লান্তিকর ছিল। প্রায় দুই ঘণ্টা ড্রেসিংরুমে বসে থেকেও পুরোপুরি মনোযোগ ধরে রাখা সহজ নয়।"
ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম্পস অবশ্য পরিস্থিতিকে কিছুটা হাস্যরসের সঙ্গে নিয়েছিলেন।
তিনি মজা করে বলেন,
"আমরা তাস খেলছিলাম।"
পরে তিনি যোগ করেন,
"আসলে আমরা শুধু অপেক্ষা করছিলাম। বারবার নতুন সময় দেওয়া হচ্ছিল। আমি খেলোয়াড়দের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, গল্প করেছি। নিরাপত্তার প্রশ্নে বৃষ্টি বা বজ্রপাতের বিরুদ্ধে তো লড়া যায় না।"
দেশম্পসের মতে, এমন পরিস্থিতি বিরক্তিকর হলেও ঝুঁকি নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

ইরাকের প্রস্তুতি ছিল ভিডিও বিশ্লেষণ
ইরাকের অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড বিরতির সময়টাকে কাজে লাগিয়েছেন ম্যাচ বিশ্লেষণের জন্য।
তিনি বলেন,
"আমরা প্রথমার্ধের ভিডিও ফুটেজ দেখেছি। খেলোয়াড়দের বিশ্রাম নিতে দিয়েছি এবং আবার মাঠে নামার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছি।"
তবে তার মতে, দীর্ঘ বিরতি ইরাকের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পর গোলকিক থেকে ভুল করে বসে ইরাক, যা থেকে ফ্রান্স দ্বিতীয় গোলটি পেয়ে যায়।
আর্নল্ড বলেন,
"আমি খেলোয়াড়দের বলেছিলাম, বিরতির পর যে দল মানসিকভাবে বেশি প্রস্তুত থাকবে তারাই সুবিধা পাবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের একটি ভুল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।"
ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা করেছিলেন সাইক্লিং
ফ্রান্সের ডিফেন্ডার জুলস কুন্দে জানিয়েছেন, দীর্ঘ বিরতির সময় শরীর সচল রাখতে খেলোয়াড়রা বিভিন্ন ধরনের অনুশীলন করেছেন।
তিনি বলেন,
"আমরা কিছু সময় সাইক্লিং করেছি, শরীর সচল রেখেছি। পরে বসে গল্প করেছি এবং আবার মাঠে ফেরার অপেক্ষা করেছি।"
কুন্দে আরও জানান, মাঠে কিছু জায়গায় পানি জমে গিয়েছিল। ফলে ম্যাচ পুনরায় শুরু করার আগে মাঠ খেলার উপযোগী কি না সেটিও নিশ্চিত হতে হয়েছিল।
স্টেডিয়াম কর্মীরা বিশেষ রাবার স্কুইজি ব্যবহার করে মাঠের জমে থাকা পানি সরিয়ে দেন।
দর্শকদের জন্যও ছিল কঠিন পরীক্ষা
প্রায় ৬৮ হাজার দর্শককে বিরতির সময় স্টেডিয়ামের নিরাপদ অংশে আশ্রয় নিতে বলা হয়।
ঘনঘন ঘোষণার মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে সবাইকে অবহিত রাখা হয়।
যখন অবশেষে জানানো হয় যে আবহাওয়ার ঝুঁকি কেটে গেছে এবং খেলা পুনরায় শুরু হবে, তখন পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে উল্লাসধ্বনি শোনা যায়।
বৃষ্টির মধ্যে রেইনকোট ও পঞ্চো পরে দর্শকদের অনেকেই গান গেয়েছেন, নেচেছেন এবং নতুন করে ম্যাচ উপভোগের প্রস্তুতি নিয়েছেন।
দীর্ঘ বিরতি কি ফ্রান্সের জন্য সুবিধা হয়ে দাঁড়ায়?
বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভের বিশ্লেষক ও স্কটল্যান্ডের সাবেক উইঙ্গার প্যাট নেভিন মনে করেন, দীর্ঘ বিরতিটি শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের পক্ষেই গেছে।
তার মতে,
"এ ধরনের বিরতি খেলোয়াড়দের রিহাইড্রেশন, খাদ্যাভ্যাস এবং পরবর্তী সূচি পুরোপুরি বদলে দেয়। তবে অদ্ভুতভাবে বিরতির পর ফ্রান্স আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে এবং ম্যাচের বাকি অংশে পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে।"
আবহাওয়া বিরতিতে সাধারণত কী করেন খেলোয়াড়রা?
বর্তমানে মেজর লিগ সকার ক্লাব স্পোর্টিং কানসাস সিটির সহকারী কোচ এদু রুবিও জানিয়েছেন, আবহাওয়া বিরতির সময় খেলোয়াড়দের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি ধরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, সাধারণত খেলোয়াড়দের আরামদায়ক পোশাক পরতে দেওয়া হয়, সাইক্লিং, স্ট্রেচিং, যোগব্যায়াম কিংবা হালকা বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি বলেন,
"আমরা একবার খেলোয়াড়দের ফুটবল-টেনিস খেলিয়েছিলাম, যাতে তারা আবহাওয়ার বিষয়টি ভুলে থাকতে পারে। সংগীত, বিশ্রাম ও হালকা অনুশীলনই এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর।"
নকআউটে ফ্রান্স
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মাঠে ফিরে ফ্রান্স নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। এমবাপ্পের জোড়া গোল এবং দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স তাদের টানা দ্বিতীয় জয় এনে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই ম্যাচটি শুধু ফলাফলের জন্য নয়, বরং দুই ঘণ্টারও বেশি সময়ের বিরতি, মানসিক ধৈর্য এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।