‘ঈদের দিন বিকেলে খাবার রান্না করে নিয়ে পরিবারসহ মাকে দেখতে গিয়েছিলাম। মায়ের সময়জ্ঞান তেমন ছিল না। মোবাইলেও সময় সেভাবে দেখতে পারতেন না। তাই একটি দেয়ালঘড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম, দেয়ালে তা টাঙানো হয়।’ কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান। তিনি রাজধানীর মিরপুরের বাসায় মারা যাওয়া প্রবীণ নারী নূর জাহান বেগমের ছোট ছেলে।
নূর জাহান বেগমের লাশ উদ্ধার হওয়ার পর ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। তাঁর এক ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব। আজ বুধবার দুপুরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন আছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরে বিকেলে ওই যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্ম সচিব) পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
এর মধ্যে দুপুরে প্রথম আলো প্রতিবেদককে ফোন করেন নূর জাহান বেগমের ছোট ছেলে অধ্যাপক আশিকুর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার তাঁকে ফোন করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তবে আজ তিনি তাঁর নাম, পরিচয় প্রকাশ করতে আপত্তি জানাননি।
আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পর আমরা এমনিতেই মানসিক ট্রমার মধ্যে আছি। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের নিয়ে নানা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, এতে আমরা মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েছি।’
৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ গত ৩১ মে রাতে উদ্ধার করে পুলিশ। নূর জাহান বেগম তাঁর মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার সঙ্গে থাকতেন। মেয়ের ফ্ল্যাটেই মারা যান। তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ওই বাসার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নূর জাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।
আশিকুর রহমান জানান, তাঁদের বাবা মো. আবুল কাশেম বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনে (বিআইডব্লিউটিসি) চাকরি করতেন। ২০০৮ সালে তিনি মারা যান। আর বোন ফাতিমা নাসরীনের স্বামী মারা গেছেন ২০১৭ সালে। তাঁর কোনো ছেলেমেয়ে নেই। সে কারণে বাসায় মা–মেয়ে দুজনই থাকতেন।
অধ্যাপক আশিকুর রহমান বলেন, মা মারা যাওয়ার পর থেকে অনেকেই বলছেন, ছেলেমেয়েরা মাকে দেখভাল করেননি। বিষয়টি সত্য নয়।
আশিকুর রহমান বলেন, ২০০৯ সালে মাকে তিনি নিজের কাছে নিয়ে আসেন। ২০১১-২০১২ সালে তিনি দেশের বাইরে ছিলেন, তখন তাঁর শাশুড়ির বাসায় মাকে রেখেছিলেন। ২০১৩ সালে আবার নিজের কাছে আনেন। মা মাঝেমধ্যে চাঁদপুরের মতলবে নানাবাড়িতে গিয়েও থাকতেন। ২০২০ সালে করোনার সময় মায়ের করোনার চিকিৎসা করান।
২০২৪ সাল থেকে মা তাঁর বোনের সঙ্গে থাকছিলেন জানিয়ে আশিকুর রহমান বলেন, তাঁর মায়ের মধ্যে সবকিছু নিয়ে সন্দেহ করার প্রবণতা ছিল। অনেকটা সিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গে মেলে। তবে এ নিয়ে মাকে কখনো চিকিৎসক দেখানো হয়নি। তাঁর বাবা বেঁচে থাকা অবস্থায় মা কোনো একটা ওষুধ খেতেন বলে জানান তিনি।