নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পেরিয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের প্রভাব ও রেশ এখনো রয়ে গেছে। ফলে একটি নবনির্বাচিত সরকারকে বিচার করার জন্য ছয় মাস নিঃসন্দেহে কম সময়। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েও বলা যায়, এই অল্প সময়ে প্রণীত বিভিন্ন আইন ও আইনের খসড়া পর্যালোচনা করলে সরকারের মূল অভিমুখ বা দৃষ্টিভঙ্গি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিএনপির রাজনৈতিক অভিমুখ কোন দিকে
নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পেরিয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের প্রভাব ও রেশ এখনো রয়ে গেছে। ফলে একটি নবনির্বাচিত সরকারকে বিচার করার জন্য ছয় মাস নিঃসন্দেহে কম সময়। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েও বলা যায়, এই অল্প সময়ে প্রণীত বিভিন্ন আইন ও আইনের খসড়া পর্যালোচনা করলে সরকারের মূল অভিমুখ বা দৃষ্টিভঙ্গি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সরকারের প্রথম ছয় মাসকে কোনো প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের চূড়ান্ত মানদণ্ড বলা কঠিন। রাষ্ট্র পরিচালনার উত্তরাধিকার, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষত রাতারাতি মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু আইন প্রণয়ন একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ সরকার কোন পথে এগোচ্ছে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে কতটুকু শিক্ষা নিচ্ছে, কিংবা নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণে তাদের মনোভাব কেমন, তার একটি ধারণা পাওয়া যাচ্ছে এই খসড়া আইনগুলো থেকে। এই জায়গাটিই বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত। কারণ একটি সরকার কতটা সংস্কারমুখী, কতটা অধিকারসংবেদনশীল এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগে কতটা সংযত, তার আভাস পাওয়া যায় আইন ও নীতিমালার ভাষ্যে।
কঠোর শাস্তির প্রবণতা
সদ্য পাস হওয়া ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এতে সাইবার মাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার হওয়াও বাধ্যতামূলক নয়। এই বিধানের মধ্যেই বড় একটি প্রশ্ন নিহিত আছে। অপরাধের ধরন, ভূমিকা, উদ্দেশ্য এবং প্রমাণের মাত্রা বিবেচনা না করে কঠোরতম শাস্তির বিধান করলে বিচারব্যবস্থায় অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হাতে যত বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, অপব্যবহারের সম্ভাবনাও তত বাড়ে। বিশেষত যখন অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ আলামতের প্রয়োজনীয়তা শিথিল করা হয়, তখন ভুল মামলা, হয়রানি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।অতীতের অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই অপরাধ নির্মূল হয় না। কার্যকর তদন্ত, দক্ষ প্রসিকিউশন, বিচারিক স্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিই শেষ পর্যন্ত আইনের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে।
সাইবার আইনে পুরোনো আশঙ্কার প্রত্যাবর্তন
ডিজিটাল পরিসর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আরও সংবেদনশীল। আওয়ামী লীগ আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও আন্দোলন হয়েছিল। পরে সেটি সংশোধিত হয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনে রূপ নেয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেটিও বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে সংসদে সাইবার সুরক্ষা বিল পাস হয়েছে।সম্প্রতি এই আইনে আরও সংশোধনী আনার আলোচনা সামনে এসেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ থাকতে পারে।গুজব ও অপতথ্য নিঃসন্দেহে সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় সমস্যা। কিন্তু সমস্যা মোকাবিলায় শুধু শাস্তি বাড়ানো কতটা কার্যকর, সেটিই প্রশ্ন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক কাঠামো অত্যন্ত জটিল। কোনো তথ্যের মূল উৎস কোথায়, কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেটি তৈরি করেছে এবং কে সত্য মনে করে তা শেয়ার করেছে, এই তিনটি বিষয় এক নয়। আইন যদি এই পার্থক্য নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, তাহলে অপরাধ দমনের নামে নির্দোষ নাগরিকও আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।এখানেই বাক্স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে আসে। অপতথ্য প্রতিরোধের নামে যদি সমালোচনামূলক মতামত, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিক অসন্তোষকে অপরাধের আওতায় আনা হয়, তাহলে আইন তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হতে পারে।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বনাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রত্যাশা। দীর্ঘ রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব করা।সেই জায়গা থেকে নতুন আইনগুলোর চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।আপাতদৃষ্টিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অপতথ্য প্রতিরোধ দুটি আলাদা বিষয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই যদি সমাধানের প্রধান হাতিয়ার হয় অধিকতর শাস্তি, তাহলে একটি অভিন্ন প্রবণতা দৃশ্যমান হয়।রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কি অপরাধের কারণ মোকাবিলায় যাবে, নাকি কেবল অপরাধের পর শাস্তির মাত্রা বাড়াবে?এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতে বাংলাদেশে কঠোর আইন অনেক সময় বিরোধী মত দমন, রাজনৈতিক হয়রানি এবং নাগরিক অধিকার সংকুচিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ হলো ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম একটি গভীর ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ ‘গুম হইতে সকল ব্যক্তিকে সুরক্ষার নিমিত্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন’-এ অনুস্বাক্ষর করে। এটি ছিল মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।এরপর ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করা হয়। সেখানে গুমের একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণের পাশাপাশি তদন্তের ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল।এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত যুক্তি ছিল শক্তিশালী। অভিযোগ যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে হয়, তাহলে একই বাহিনীর হাতে তদন্তের সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকলে নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
তদন্তের ভার কার হাতে?
এখানেই নতুন খসড়া আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে।পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা। নতুন খসড়ায় যদি সেই দায়িত্ব আবার পুলিশ বা ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ফিরে যায়, তাহলে স্বাধীন তদন্তের প্রশ্নটি দুর্বল হতে পারে।গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ‘কে করবে’—এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব ঘটনার তদন্ত করার কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু যে বাহিনীর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে গুম বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তারা কীভাবে নিজেদের সহকর্মীদের অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে? এ কারণেই অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এখানে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক এখতিয়ার নিয়ে নয়। এটি জবাবদিহির স্থাপত্য নিয়ে প্রশ্ন।কোনো রাষ্ট্র যদি অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার করতে চায়, তাহলে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত রাখা প্রয়োজন।
মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা ও স্বাধীনতার প্রশ্নটিও তাই আলোচনার বাইরে রাখা যায় না।২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশন গঠন ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরির উদ্যোগ ছিল। নতুন খসড়ায় সেই কাঠামো দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠানটি কেবল নামসর্বস্ব হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।একটি কার্যকর মানবাধিকার কমিশন কেবল অভিযোগ গ্রহণের দপ্তর নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর একটি প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ব্যবস্থাও হতে পারে।সংস্কারের লক্ষ্য যদি সত্যিই রাষ্ট্রকে নাগরিকের কাছে দায়বদ্ধ করা হয়, তাহলে এমন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনই বেশি।
তাহলে বিএনপির রাজনৈতিক অভিমুখ কী?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই চূড়ান্তভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস। অর্থনীতি, প্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের মতো বিশাল কাজ সামনে রয়েছে।তবে আইন প্রণয়নের সাম্প্রতিক প্রবণতা থেকে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়।একদিকে সরকার বলছে রাষ্ট্রকে সংস্কার করতে হবে। অন্যদিকে কিছু প্রস্তাবিত আইন রাষ্ট্রের হাতে আরও কঠোর শাস্তিমূলক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।এই দ্বৈততা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।একটি গণতান্ত্রিক সরকারের শক্তি শুধু কঠোর আইন প্রয়োগের সক্ষমতায় নয়। বরং তার শক্তি হলো ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা নিজেই নির্ধারণ করা, নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।বিএনপি সরকারের সামনে তাই বড় পরীক্ষা শুধু অর্থনীতি বা প্রশাসনিক দক্ষতার নয়। আসল পরীক্ষা রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরি করা।যদি অতীতের দমনমূলক কাঠামো থেকে শিক্ষা নিয়ে আইনগুলোকে অধিকতর ন্যায়সংগত, আনুপাতিক ও জবাবদিহিমূলক করা যায়, তাহলে ছয় মাসের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।আর যদি পুরোনো প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন কতটা এসেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে।শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের রাজনৈতিক অভিমুখ তার বক্তৃতায় নয়, তার আইন, প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতিতেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান




