শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবরগণমাধ্যম

সরকারের ছয় মাস: নাগরিক সমাজ কী পেল, কী পেল না

তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের ছয় মাস পূর্ণ হলো। মেয়াদের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় পার হলো তাঁর দলের। পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের জন্য ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়, অনেক কমও নয়। ঘরে-বাইরে এই ছয় মাসের চাওয়া-পাওয়া ও সামর্থ্যের কিছু হিসাব হবে এখন। সরকার নিজেও নিশ্চিতভাবে একটা মূল্যায়ন করবে।

TTaaraaz24bd১৭ Aug ২০২৬, ০৬:৫৪ AM18 পাঠক0 মন্তব্য
সরকারের ছয় মাস: নাগরিক সমাজ কী পেল, কী পেল না
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের ছয় মাস পূর্ণ হলো। মেয়াদের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় পার হলো তাঁর দলের। পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের জন্য ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়, অনেক কমও নয়। ঘরে-বাইরে এই ছয় মাসের চাওয়া-পাওয়া ও সামর্থ্যের কিছু হিসাব হবে এখন। সরকার নিজেও নিশ্চিতভাবে একটা মূল্যায়ন করবে।

Inside Artcle

দায়িত্ব গ্রহণের সময় ১৮০ দিনের একটি প্রাথমিক কর্মসূচির কথা বলা হয়েছিল। ফলে ছয় মাস পূর্তিতে সেই কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। রাষ্ট্র পরিচালনার এই প্রাথমিক পর্যায়ে সরকার কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের পাশাপাশি বেশ কিছু জটিলতার মুখোমুখিও হয়েছে। নাগরিক সমাজের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাই হচ্ছে, পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা নিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তার কতটা বাস্তব রূপ পেয়েছে।

শুরুর আশাবাদ থেকে বাস্তবতার টানাপোড়েন

সরকারের যাত্রার শুরুতে কিছু সিদ্ধান্ত জনমনে আশাবাদ তৈরি করেছিল। সংসদ সদস্যদের করমুক্ত গাড়ি আমদানি ও প্লট সুবিধা বন্ধের মতো উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহারে সংযমের বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি ও জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ দৃশ্যমান হয়েছে।

বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের সংকট শিল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। গ্যাসের অপ্রতুলতা শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হলে তার অভিঘাত পড়ে সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রায়। চিনি, গম ও তেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে। এখানে প্রশ্নটি কেবল বর্তমান সংকট নিয়ে নয়। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চাহিদা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কতটা সুদূরপ্রসারী ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ

বিএনপির ঘোষিত ‘৩১ দফা’র ১৭তম দফায় আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য ও মিশ্র জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং উপেক্ষিত গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছিল। ছয় মাস পর সেই অঙ্গীকারের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন।

জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বিনিয়োগের সম্পর্ক সরাসরি। উদ্যোক্তারা স্থিতিশীল বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং পূর্বানুমেয় নীতি চান। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যায়। ব্যবসা কমলে রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন হ্রাস, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া এবং রাজস্ব ঘাটতি একটি পরস্পরনির্ভর চক্র তৈরি করতে পারে।

ব্যাংক খাতও এখানে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বহু গ্রাহকের অর্থ আটকে আছে। ছয় মাসের মধ্যে এই সংকটের দৃশ্যমান ও টেকসই সমাধান নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

কৃষকের জন্য কিছু স্বস্তি, কিন্তু মৌলিক সমস্যা বহাল

সরকারের শুরুর মাসে কৃষকদের একটি অংশের ব্যাংকঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত স্বস্তি এনেছিল। প্রায় ১৩ লাখ কৃষক এতে তাৎক্ষণিকভাবে উপকৃত হন বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু কৃষকের সংকট শুধু ঋণ দিয়ে শেষ হয় না।

বীজ, সার, সেচ, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে ফসলের ন্যায্যমূল্য কৃষকের দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিএনপির ৩১ দফার ২৭তম দফায় কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। ছয় মাসে এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতদূর এগিয়েছে, তা নিয়ে কৃষকসমাজের সঙ্গে আরও কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নাগরিক উদ্বেগ

নতুন সরকারের কাছে মানুষের অন্যতম তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা ছিল আইনশৃঙ্খলার উন্নতি। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ড এবং বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ তৈরি করছে।

কোনো রাষ্ট্রে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু সামাজিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিনিয়োগ, ব্যবসা এবং নাগরিক আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কেবল পুলিশি দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সামগ্রিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

প্রশাসন কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে?

ছয় মাসের মূল্যায়নে আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে প্রশাসনিক দক্ষতা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরে কত দ্রুত বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটি সরকারের কার্যকারিতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীর ভেতর থেকে আন্তজেলা বাসের কাউন্টার সরানোর মতো নির্দেশ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এটি একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতীকও হতে পারে। নীতিনির্ধারণের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের দূরত্ব কমাতে না পারলে ভালো উদ্যোগও কাগজে আটকে যায়।

বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো এখনো অত্যন্ত কেন্দ্রাভিমুখী। স্থানীয় সরকারকে অধিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা দীর্ঘদিনের। কিন্তু বাস্তব বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া প্রশাসনিক সংস্কারের সুফল সীমিত থেকে যেতে পারে।

দলীয় আনুগত্য বনাম প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা

সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা স্পষ্ট। রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। নৌপরিবহন, বস্ত্র, কৃষি, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনীতির মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক কর্মীর প্রতি সম্মান থাকা এক বিষয়, আর একটি বিশেষায়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা আরেক বিষয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্র বানানো হলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। আর প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাগরিকরাই।

সংস্কারের প্রশ্নে নাগরিক সমাজের উদ্বেগ

নতুন সরকারের প্রতি সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার। আন্দোলনের সময় মেধাভিত্তিক নিয়োগ, মানবাধিকার, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার দাবি সামনে এসেছিল। এই জায়গায় গুম প্রতিরোধ আইন ও মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে বিতর্ক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নাগরিক সমাজের প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন আইনগুলো সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে, নাকি পুরোনো কাঠামোর নতুন সংস্করণ হয়ে থাকবে।

মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকলে কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একইভাবে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে কার্যকর, স্বাধীন এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থা না থাকলে আইনের উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এখানে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচিত সরকার মানেই সরকারের সব সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত হবে, এমন ধারণা গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং শক্তিশালী গণতন্ত্রে সরকারকে যেমন জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করতে হয়, তেমনি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

ছয় মাসের হিসাব: অর্জন ও অপূর্ণতার মাঝখানে

তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের ছয় মাস তাই একরৈখিক সাফল্য বা ব্যর্থতার গল্প নয়। কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ স্বস্তি দিয়েছে। কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপও দেখা গেছে। কিন্তু জ্বালানি, ব্যাংকিং, আইনশৃঙ্খলা, কৃষি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে এখনও বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জনগণের প্রত্যাশা এখন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষ চায় কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নিরাপদ জীবন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় সেবায় সমতা। ছয় মাস একটি সরকারের জন্য চূড়ান্ত বিচারের সময় নয়। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেতের মুহূর্ত। সরকার যদি এই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্ব কমাতে পারে, তাহলে সামনে আরও কার্যকর পথ তৈরি হতে পারে। আর নাগরিক সমাজের দায়িত্বও কম নয়। নির্বাচিত সরকারকে তার প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেওয়া, ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা এবং সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার থাকা গণতান্ত্রিক পরিসরের অপরিহার্য অংশ। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হয় শুধু ক্ষমতার পালাবদলে নয়। নির্ধারিত হয় প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী হলো এবং সাধারণ নাগরিকের জীবন কতটা বদলাল, তার ওপর।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

sticky add
Popup