যারা দেশে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদেরকে ‘চোখে চোখে’ নজরদারিতে রাখতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
যারা দেশে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদেরকে ‘চোখে চোখে’ নজরদারিতে রাখতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে যারা বিভ্রান্তি ছড়ায় তাদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে একই পরিসরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘দেশে অনেক বিভ্রান্তকারী আছে, অনেক রটনাকারী আছে। এদের ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। দেখতে হবে এরা অতীতে কী করেছে? সেই অতীত বিবেচনা করে আমাদের তাদেরকে চোখে চোখে রাখতে হবে, অতীত বিবেচনা করেই ভবিষ্যতে তারা কী করছে সেদিকে আমাদেরকে নজর রাখতে হবে।’
রোববার বিকেলে পুরাতন কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেখানে নারীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে সম্মানি প্রদান এবং অসচ্ছল ও প্রতিবন্ধীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হাতে চাকরির নিয়োগপত্রও তুলে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশকে আমাদের স্থিতিশীল রাখতে হবে। কোন বিভ্রান্তকারীর কথায় বিভ্রান্ত হলে চলবে না। বিভ্রান্তকারীরা যদি বিভ্রান্ত করতে আসে অতীতের মত তাদেরকে সমুচিত জবাব দিতে হবে।’ তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জনগণের সচেতনতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এরা অতীতে কী করেছে তা বিবেচনায় নিয়ে এদের চোখে চোখে রাখতে হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক ঘটনাবলী এবং বিগত ১৭ বছরের জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথে এদের কোনো ভূমিকা ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছরের আন্দোলনে বিএনপি ও তাদের মিত্র দলের নেতাকর্মীরা গুম, খুন, নির্যাতন ও অত্যাচারের শিকার হয়েছেন।
সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য
সাম্প্রতিক ‘সংস্কার’ সংক্রান্ত আলোচনার প্রসঙ্গও উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর ধরে রাজপথে অনুপস্থিত থেকে যারা আজ সংস্কারের নামে বড় বড় কথা বলছেন, তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।’ প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, বিএনপি ২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল। এরও আগে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশে সংস্কারের প্রথম প্রস্তাবনা তৈরি হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই বক্তব্যে রাজনৈতিক সংস্কারকে কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়।
ফ্যামিলি কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা
কিশোরগঞ্জের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।
কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য নতুন মিল-কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষকে পেছনে রেখে বা তাদের সঠিকভাবে তৈরি করতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারা যাবে না।’ তাঁর মতে, অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল নাগরিক তৈরি করাই টেকসই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।
নারীর ক্ষমতায়ন
দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের বাদ দিয়ে কোনো দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। নারীদের আত্মনির্ভরশীল ও ক্ষমতায়িত করতে ফ্যামিলি কার্ডের মতো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এই কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবারকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি নারীদের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ এবং ভালো ফলাফলের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।
কৃষকের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি
কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করাকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী কৃষক কার্ডের কথা বলেন। তিনি জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের ১৩ লাখ কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পানি সংকট মোকাবিলায় দেশব্যাপী আড়াইশ কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। কৃষি অর্থনীতির জন্য এ ধরনের অবকাঠামোগত উদ্যোগকে তিনি উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের স্বনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত করেন।
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও তরুণ প্রজন্ম
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ভাষাগত দক্ষতার মাধ্যমে তাদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চালু করা ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা পুনরায় চালুর কথাও জানান তিনি। তাঁর মতে, শিশু-কিশোরদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের জন্য সহায়তা
সমাজের দিকনির্দেশক হিসেবে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আত্মনির্ভরশীল রাখতে বিশেষ সামাজিক ভাতা দেওয়ার কথা বলেন।
একই সঙ্গে অসচ্ছল ব্যক্তি, শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘স্বৈরাচারের সময় বঞ্চনার শিকার ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষকের অবসর ভাতার জটিলতা নিরসন করে অর্থ প্রদান সম্পন্ন করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার।’
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি এমন রাজনীতিতে বিশ্বাস করে যা মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, শিক্ষায় সহায়তা দেয়, কৃষকের উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখে এবং শিল্পকারখানা গড়ে তোলে।
নির্বাচনের আগে দেওয়া অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বার্তা ছিল অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্যই হচ্ছে দেশের জন্য কাজ করা, মানুষের জন্য কাজ করা। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারলেই একমাত্র দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করা যাবে।’
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন সভাপতিত্ব করেন। বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, মাজহারুল ইসলাম ও জালাল উদ্দীনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
কিশোরগঞ্জের এই আয়োজন তাই একই সঙ্গে রাজনৈতিক সতর্কতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার বার্তা বহন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিরুদ্ধে জনগণের সচেতনতার পাশাপাশি নারী, কৃষক, তরুণ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।