নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ জনে। একই সঙ্গে বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। হিমালয়ের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যা, কাদামাটির স্রোত এবং ভূমিধসের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
নেপাল-তিব্বতে বন্যা ও ভূমিধসে ১৬৫ জনের মৃত্যু, নিখোঁজদের সন্ধান
নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ জনে। একই সঙ্গে বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। হিমালয়ের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যা, কাদামাটির স্রোত এবং ভূমিধসের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংসহ কয়েকটি এলাকা দুর্যোগে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তিব্বতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৫৫৮ জনে পৌঁছেছে, যাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক বলে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এই বিপর্যয়ের মাত্রা বোঝাতে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা যথেষ্ট নয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া জনপদ, বিধ্বস্ত সড়ক ও সেতু এবং বিপজ্জনক পাহাড়ি ঢাল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত হিমালয় অঞ্চল
দুর্যোগের পেছনে হিমবাহ ধস, অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি নদীর আকস্মিক পানিপ্রবাহের মতো একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। উচ্চভূমিতে বরফ, পাথর ও মাটি নেমে এসে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে ধেয়ে যেতে পারে।
নেপালের ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় পানির উচ্চতা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি উপত্যকায় বসতি ঘন হওয়ায় পানির স্রোত ও ভূমিধসের ক্ষয়ক্ষতিও দ্রুত বিস্তৃত হয়।
এ ধরনের দুর্যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর আকস্মিকতা। সমতল এলাকার বন্যার তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় প্রস্তুতির সময় অনেক কম থাকে। ফলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
১৬৫ জনের মৃত্যু, বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যা
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে ১৬৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৮২৬ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্যও সামনে এসেছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপালের সেনাবাহিনী ও পুলিশ উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়কপথ পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে, যাতে ত্রাণ ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো যায়।
তবে উদ্ধারকাজের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভূপ্রকৃতি। পাহাড়ি ঢালে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকারীদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
তিব্বতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ
চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে সেখানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
এই অঞ্চলে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের চলাচল থাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনও একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ উদ্ধার অভিযানে বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োজিত করেছে। অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী, প্রকৌশলী, সামরিক সদস্য এবং স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। অনুসন্ধানী কুকুর, ড্রোন ও নৌযানও ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই অনুসন্ধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক জায়গায় সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
নতুন বন্যার আশঙ্কা
দুর্যোগের পরও বিপদ শেষ হয়নি। তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় একটি বাধাপ্রাপ্ত জলাধার বা barrier lake তৈরি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাহাড়ি নদীর প্রবাহে ভূমিধস বা পাথর জমে নদীর পথ আংশিক বন্ধ হয়ে গেলে এ ধরনের জলাধার সৃষ্টি হতে পারে।
জলাধারটির বাঁধ ভেঙে গেলে আকস্মিকভাবে বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে আসার আশঙ্কা থাকে। তাই উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নদীর পানি ও ভূমির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
এটি উদ্ধারকারীদের জন্য এক ধরনের দ্বৈত ঝুঁকি তৈরি করেছে। একদিকে নিখোঁজদের সন্ধান করতে হবে, অন্যদিকে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার দুর্যোগ থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে হবে।
বিদেশি নাগরিকদের নিয়ে উদ্বেগ
নেপাল ও তিব্বতের এই অঞ্চল আন্তর্জাতিক পর্যটন ও ধর্মীয় ভ্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৈলাস-মানসসরোবরের দিকে যাওয়া তীর্থযাত্রীদের একটি অংশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো ব্যবহার করেন।
নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য দেশের নাগরিক থাকার খবর পাওয়া গেছে।
তিব্বতে ২৬০ বিদেশি নাগরিকের নিখোঁজ থাকার তথ্য পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষের জন্য এখন নাগরিকদের অবস্থান নিশ্চিত করা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার বড় চ্যালেঞ্জ
বন্যা ও ভূমিধসে বহু সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে একটি সেতু ধসে পড়া মানেই অনেক সময় পুরো একটি এলাকার সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও কিছু এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলকে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করতে বিকল্প প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ড্রোন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আকাশপথে দুর্গম এলাকা পর্যবেক্ষণ করে কোথায় মানুষ আটকে আছে, কোথায় ভূমিধস হয়েছে কিংবা কোন পথ তুলনামূলক নিরাপদ, তা দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন
হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম সংবেদনশীল পার্বত্য পরিবেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহের স্থিতিশীলতা, তুষারস্তর এবং উচ্চভূমির জলপ্রবাহে পরিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে একক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে সতর্কতার দাবি রাখে। এই ঘটনায় স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, বৃষ্টিপাত, হিমবাহের অবস্থা এবং ভূমিধসের মতো একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করে থাকতে পারে।
তারপরও এই বিপর্যয় হিমালয় অঞ্চলে আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।
নিখোঁজদের সন্ধান এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো নিখোঁজ মানুষদের খুঁজে বের করা এবং জীবিতদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। সময় এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারী দলগুলো প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। হেলিকপ্টার, ড্রোন, অনুসন্ধানী কুকুর এবং বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করে তল্লাশি চলছে।
এই বিপর্যয় একই সঙ্গে একটি মানবিক সংকট এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কঠিন পরীক্ষা। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আন্তঃসীমান্ত তথ্য বিনিময়, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
হিমালয়ের বিস্তীর্ণ ভূপ্রকৃতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু দুর্যোগের আগাম সংকেত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এবং বিপর্যয়ের পর সমন্বিত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা মানুষের সক্ষমতার মধ্যেই পড়ে।
নেপাল ও তিব্বতের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই বাস্তবতাই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।