শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবরবিশ্ববাণিজ্য

ইরান নিয়ে উদ্বেগে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, বাড়ছে তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের ওপর ছায়া ফেলেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতায় প্রভাব ফেলছে। ফলে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে ওঠানামা, আর জ্বালানি বাজারে তেলের দামে তৈরি হয়েছে তীব্র অস্থিরতা।

TTaaraaz24bd২৫ Aug ২০২৬, ১১:৫৫ AM0 পাঠক0 মন্তব্য
ইরান নিয়ে উদ্বেগে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, বাড়ছে তেলের দাম
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের ওপর ছায়া ফেলেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতায় প্রভাব ফেলছে। ফলে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে ওঠানামা, আর জ্বালানি বাজারে তেলের দামে তৈরি হয়েছে তীব্র অস্থিরতা।

Inside Artcle

তবে সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। ইরান নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমেছে বা স্থিতিশীল হয়েছে। সোমবার দুই ধরনের প্রধান অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ার পর মঙ্গলবার বাজারে আবার কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা যায়। সকালে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস প্রায় ৯২ ডলারের আশপাশে এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট প্রায় ৮৫ ডলারে ছিল। 

অর্থাৎ, বাড়ছে তেলের দাম কথাটি এখানে সরলরৈখিক অর্থে না দেখে বৃহত্তর মূল্য-অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। গত দুই সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল, এরপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় বাজারে আবার কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়।

শেয়ারবাজারে কেন অস্থিরতা?

শেয়ারবাজার সাধারণত ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগেই মূল্যায়ন করে। ইরানকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি জটিল হলে বিনিয়োগকারীরা শুধু বর্তমান সংঘাতের দিকে তাকান না, বরং তেল সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং করপোরেট মুনাফার সম্ভাব্য প্রভাবও হিসাব করেন।

এই কারণেই ভূরাজনৈতিক সংকট অনেক সময় সরাসরি শেয়ারবাজারে প্রতিফলিত হয়।

২৫ আগস্ট এশিয়ার বাজারগুলোর চিত্র ছিল মিশ্র। কিছু বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বজায় ছিল। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজারগুলোও তুলনামূলকভাবে স্থির ছিল। সৌদি আরবের সূচক প্রায় অপরিবর্তিত ছিল, দুবাইয়ের বাজার সামান্য কমেছে এবং আবুধাবি ও কাতারের বাজারে সীমিত উত্থান দেখা গেছে। ফিলিপাইনের শেয়ারবাজারেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে। দেশটির প্রধান সূচক ৬,২০০ পয়েন্টের নিচে নেমে যায় বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তেলের বাজারে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব

ইরান প্রসঙ্গে তেলের বাজারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই জলপথে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।

এই আশঙ্কা থেকেই ইরানসংক্রান্ত যেকোনো সামরিক বা কূটনৈতিক খবর তেলের বাজারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সংঘাত তীব্র হলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দাম বাড়তে পারে। আবার সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে যদি অর্থনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক আলোচনার দিকে পরিস্থিতি এগোয়, তাহলে বাজারে সরবরাহ ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম বলে বিবেচিত হতে পারে।

সাম্প্রতিক বাজার প্রতিক্রিয়াতেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে বাজার সামরিক উত্তেজনার তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছে। ফলে তেলের দামে তাৎক্ষণিক বড় উল্লম্ফনের বদলে কিছুটা নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। 

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ২৪ আগস্ট ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও কঠোরভাবে চাপে ফেলা এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা পক্ষগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করা।

এই পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অবশ্য বাজারে প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত ছিল। কারণ বিনিয়োগকারীরা দেখছেন, নিষেধাজ্ঞা যতই কঠোর হোক, ইরানের তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। বিশেষ করে চীনের মতো বড় ক্রেতাদের ভূমিকা বাজারের হিসাবকে জটিল করে তুলছে। 

অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞা ঘোষণাই শেষ কথা নয়। বাজার এখন দেখছে বাস্তবে কতটা তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, পরিবহন কতটা স্বাভাবিক থাকে এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।

মূল্যস্ফীতির নতুন আশঙ্কা

তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, উৎপাদন, কৃষি, বিদ্যুৎ এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আর উচ্চ সুদের হার সাধারণত শেয়ারবাজারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, কারণ কোম্পানির ঋণ ব্যয় বাড়ে এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বদলে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।

এই সমীকরণই ইরান সংকটকে শুধু একটি ভূরাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনার কারণ তৈরি করছে।

বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন

বাজারে অস্থিরতার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক হিসাব কাজ করে না। বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ। অনিশ্চয়তার সময় বাজারে risk-off sentiment তৈরি হতে পারে। তখন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার থেকে অর্থ সরিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে যেতে পারেন।

অন্যদিকে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে একই অর্থ দ্রুত শেয়ারবাজারে ফিরে আসতে পারে। ফলে সূচকে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়, যদিও বাস্তব অর্থনীতিতে পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে ধীরগতির।

বর্তমান বাজারে ঠিক এই দ্বৈত প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে। একদিকে ইরানকে ঘিরে উদ্বেগ রয়েছে, অন্যদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা সামরিক উত্তেজনার চেয়ে অর্থনৈতিক চাপের দিকে পরিস্থিতি সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির খবরও বাজারের আশঙ্কা কিছুটা প্রশমিত করেছে। 

সামনে কী হতে পারে?

আগামী দিনগুলোতে তেলের বাজারের জন্য তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন কতটা স্বাভাবিক থাকে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে ইরানের তেল রপ্তানিতে কতটা প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, ইরান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা কোনো স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোয় কি না।

যদি উত্তেজনা বাড়ে এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। বিপরীতে কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে বাজারে ঝুঁকি-প্রিমিয়াম কমে তেলের দামও নরম হতে পারে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল ‘তেলের দাম বাড়ছে’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বাস্তবতা আরও জটিল। তেলের বাজার এখন ভূরাজনীতি, সরবরাহের সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার এক অদৃশ্য ত্রিভুজের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে উদ্বেগ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। তেলের দামও সেই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে সংবেদনশীল সূচকগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। সাময়িকভাবে দাম কমলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। বাজারের দৃষ্টি এখন কূটনৈতিক অগ্রগতি, নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রয়োগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির দিকে।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

sticky add
Popup