বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন প্রজন্মের যে কয়েকজন অভিনয়শিল্পী ধীরে ধীরে নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করছেন, লাবণ্য চৌধুরী তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি নাম। অল্প বয়সেই বড় পর্দায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া যেমন সৌভাগ্যের, তেমনি তা ধরে রাখাও কঠিন। লাবণ্যের পথচলায় এই দুই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যায়।
তরুণ অভিনেত্রী লাবণ্যকে কতটা চেনেন?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন প্রজন্মের যে কয়েকজন অভিনয়শিল্পী ধীরে ধীরে নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করছেন, লাবণ্য চৌধুরী তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি নাম। অল্প বয়সেই বড় পর্দায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া যেমন সৌভাগ্যের, তেমনি তা ধরে রাখাও কঠিন। লাবণ্যের পথচলায় এই দুই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যায়।
লাবণ্যকে অনেক দর্শক প্রথমে চিনেছেন জয়া আহসানের কিশোর বয়সের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। ‘দেবী’ সিনেমায় জয়া আহসানের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নজর কাড়েন। পরবর্তী সময়ে ‘নকশীকাঁথার জমিন’ সিনেমাতেও জয়া আহসানের কিশোর বয়সের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। একই অভিনেত্রীর জীবনের ভিন্ন সময়ের চরিত্র পর্দায় ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পাওয়া লাবণ্যের ক্যারিয়ারে নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
অভিনয়ের শুরুতেই বড় দায়িত্ব
লাবণ্য চৌধুরীর অভিনয়যাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই চরিত্রনির্ভর কাজের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে অরণ্য আনোয়ার পরিচালিত ‘বকুল’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয়ের খবর প্রকাশিত হয়। সিনেমাটির গল্প হাওরাঞ্চলের জীবন, মানুষের সংগ্রাম এবং সম্পর্কের জটিলতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত। বকুল চরিত্রে লাবণ্যের অভিনয় ছিল সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
এটি নিছক আরেকটি অভিনয়ের সুযোগ ছিল না। একজন তরুণ শিল্পীর জন্য এমন চরিত্র এক ধরনের অভিনয়-পরীক্ষা। কারণ গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক প্রতিকূলতার মতো বিষয়কে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় উপস্থাপন করতে হলে সংলাপের পাশাপাশি অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা এবং নীরব অভিনয়ের ওপরও নির্ভর করতে হয়।
হাওরভিত্তিক সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিল আলাদা। ‘কূল নাই কিনার নাই’ নামে পরিচিত সেই প্রকল্পের শুটিং নেত্রকোনার খালিয়াজুরী ও মদন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হয়েছিল। দুর্গম লোকেশনে পৌঁছাতে নৌপথে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত। সীমিত শুটিং সময়ের মধ্যেই শিল্পীদের কাজ এগিয়ে নিতে হয়েছে।
‘নকশীকাঁথার জমিনে’ লাবণ্যের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
লাবণ্যের ক্যারিয়ারে ‘নকশীকাঁথার জমিন’ বিশেষভাবে আলোচিত। আকরাম খান পরিচালিত সিনেমাটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দুই বোনের জীবনসংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। এতে জয়া আহসান রাহেলা চরিত্রে অভিনয় করেন, আর রাহেলার কিশোর বয়সের চরিত্রে দেখা যায় লাবণ্যকে।
এই চরিত্রটির বিশেষত্ব ছিল এর সংযমী নির্মাণ। লাবণ্য জানিয়েছেন, চরিত্রটি খুব বেশি কথা বলে না কিংবা হাসে না। বরং তার কর্মকাণ্ড, চোখের অভিব্যক্তি এবং শরীরী ভাষার মধ্য দিয়েই চরিত্রের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়েছে। এমন অভিনয় তরুণ শিল্পীর জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল মেকআপের ব্যবহার। চরিত্রটিকে সাধারণ গ্রামের কিশোরীর মতো উপস্থাপন করতে নির্মাতা স্বাভাবিক চেহারাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে অভিনয়ের ক্ষেত্রে বাহ্যিক চাকচিক্যের পরিবর্তে অভিব্যক্তি ও অভিনয়ক্ষমতাই হয়ে উঠেছিল মুখ্য উপাদান।
জয়া আহসানের সঙ্গে একই চরিত্রের সূত্র
লাবণ্যর অভিনয়জীবনের একটি আকর্ষণীয় সংযোগ জয়া আহসানের সঙ্গে। ‘দেবী’র পর ‘নকশীকাঁথার জমিনেও’ তিনি জয়ার কিশোর বয়সের চরিত্রে অভিনয় করেন। ২০২৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে লাবণ্য জানান, দ্বিতীয় সিনেমায় তাঁকে নেওয়ার ক্ষেত্রে জয়া আহসানের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীর সঙ্গে এমন পেশাগত সম্পর্ক নতুন শিল্পীর জন্য মূল্যবান অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। তবে শুধু পরিচিতি নয়, প্রতিটি চরিত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করাই একজন শিল্পীর দীর্ঘমেয়াদি পরিচয় নির্ধারণ করে।
সামনে আরও কিছু কাজ
লাবণ্য চৌধুরীর অভিনীত আরও কয়েকটি প্রকল্প নিয়েও বিভিন্ন সময়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অরণ্য আনোয়ারের ‘হাওড়’ এবং আওয়াল চৌধুরীর ‘আগুনের পাখি’ ছিল তাঁর আলোচিত কাজের তালিকায়। পাশাপাশি ‘শিরিনের একাত্তর যাত্রা’ ও ‘অয়নের গল্প’ নামের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও তাঁর কাজের কথা জানা যায়।
এ ছাড়া ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার কাস্ট তালিকাতেও লাবণ্য চৌধুরীকে রুবি চরিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন আলাদা করে নজরে লাবণ্য?
লাবণ্যের অভিনয়যাত্রার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট। তিনি কেবল তারকা হওয়ার দৌড়ে নেই; বরং চরিত্রনির্ভর কাজের মধ্য দিয়ে নিজের অভিনয়ভাষা নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছেন। কখনো গ্রামীণ জীবনের সংগ্রামী তরুণী, কখনো মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বেড়ে ওঠা কিশোরী, আবার কখনো প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীর ছোটবেলার চরিত্র। বৈচিত্র্যই এখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তরুণ শিল্পীদের ক্ষেত্রে দর্শকের প্রত্যাশা সাধারণত দ্রুত বাড়ে। কিন্তু অভিনয় একটি দীর্ঘমেয়াদি সাধনা। একটি ভালো চরিত্র একজন অভিনেতাকে পরিচিত করে তুলতে পারে, আর ধারাবাহিক ভালো কাজ তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
লাবণ্যের সামনে সেই সম্ভাবনাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর ক্যারিয়ার এখনও নির্মীয়মাণ। তাই এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় নয়। বরং সামনে তিনি কী ধরনের চরিত্র বেছে নেন, কতটা পরিণত অভিনয় উপহার দেন এবং বড় পর্দায় নিজের স্বতন্ত্র উপস্থিতি কতটা দৃঢ় করতে পারেন, সেটিই হয়ে উঠবে মূল বিবেচ্য।
সব মিলিয়ে, লাবণ্য চৌধুরী এমন এক তরুণ অভিনেত্রী, যাঁর পথচলা ইতোমধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সাক্ষ্য বহন করছে। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি হয়তো এখনও ক্রমবর্ধমান। কিন্তু শুরুতেই যে চরিত্রভিত্তিক কাজের অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছেন, তা ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় তাই লাবণ্যের নামটি নজরে রাখার মতো। সময়ই বলে দেবে, এই সম্ভাবনা কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।