চীনে রোবোটিকস এখন আর কেবল গবেষণাগারের সীমাবদ্ধ প্রযুক্তি নয়। এটি পরিণত হয়েছে শিল্পনীতি, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় সক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটছে রোবট প্রতিযোগিতায়। চীনে চলছে আন্তর্জাতিক ‘রোবট অলিম্পিক’। মানব অলিম্পিকের মতো এখানেও প্রতিযোগিতা হচ্ছে। তবে প্রায় সব পদকই জিতে নিচ্ছে চীনের দল।
প্রতিযোগিতাগুলো অনেকটা বিজ্ঞান প্রকল্পের মতো ছিল। ছোট চাকার রোবট ফুটবল খেলত। তাদের কাজ ছিল বল খুঁজে বের করা এবং অন্য রোবটের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা।
রোবটগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে সরল। সেন্সর, পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা এবং সীমিত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তাদের পরিচালনার মূল ভিত্তি ছিল।
তবু এই ছোট ছোট প্রতিযোগিতাই ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশলভিত্তি তৈরি করে। শিক্ষার্থীরা শুধু রোবট বানানো শেখেননি, বরং যন্ত্রকে পরিবেশ বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে শেখানোর প্রাথমিক অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছিলেন।
২০১৫: রোবোটিকস হয়ে উঠল ‘মুকুটের রত্ন’
পরবর্তী বড় বাঁক আসে ২০১৫ সালে।
বেইজিংয়ে প্রথম ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। রোবোটিকস তখন আর নিছক প্রযুক্তিপ্রেমীদের বিনোদন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতির অংশ হয়ে উঠতে শুরু করে।
২০১৫ সালে বেইজিংয়ে প্রথম ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে রোবোটিকস খাত জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়।
এর আগে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, সি চিন পিং রোবোটিকসকে উন্নত উৎপাদন শিল্পের ‘মুকুটের রত্ন’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
সেই সময়ের প্রদর্শনীতে চলনশীল রোবট ব্যাডমিন্টন খেলত। রোবটগুলো শাটলককের গতিপথ অনুসরণ করে সেটি ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত।
দর্শকদের কাছে এটি ছিল চমকপ্রদ। প্রযুক্তিবিদদের কাছে ছিল একটি পরীক্ষামূলক মাইলফলক।
এসব রোবট দূরত্ব ও ছবি শনাক্তকারী সেন্সরের ওপর নির্ভর করত। কোনো বস্তুর সম্ভাব্য গতিপথ অনুমান করার প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হতো। সেই প্রযুক্তির শিকড় আরও পুরোনো গবেষণায় নিহিত ছিল।
২০২৩: গবেষণাগার থেকে বসার ঘরে
২০২৩ সালের মধ্যে পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়।
ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স পরিণত হয় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির উদ্ভাবন প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে। দর্শকদের সামনে রোবট দেখানো হচ্ছিল শুধু ভবিষ্যতের কল্পনা হিসেবে নয়, সম্ভাব্য ভোক্তা পণ্য হিসেবেও।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ছিল শাওমির রোবট কুকুর ‘সাইবারডগ’।
দর্শকেরা সেটিকে দেখতে ভিড় করছিলেন। অনেকে স্মার্টফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। প্রযুক্তি তখন গবেষণাগারের কাচঘেরা পরিবেশ থেকে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কৌতূহলের অংশ হয়ে উঠেছে।
আর এখানেই ‘খেলনার প্রযুক্তি’ কথাটির তাৎপর্য।
শুরুতে যে প্রযুক্তি বিনোদন, প্রদর্শনী বা শখের প্রকল্প বলে মনে হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে উন্নত সেন্সর, মোটর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে।
শাওমির সাইবারডগের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার, যেখানে বোস্টন ডায়নামিকসের চার পা-ওয়ালা ‘স্পট’ রোবটের দাম ছিল ৭৫ হাজার ডলারের বেশি।
এই মূল্য ব্যবধান চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাকে সামনে আনে: কম খরচে জটিল প্রযুক্তি তৈরি করার ক্ষমতা।
২০২৫ থেকে ২০২৬: হোঁচট থেকে দৌড়
রোবটের সক্ষমতা কত দ্রুত বাড়ছে, তার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ পাওয়া যায় দৌড় প্রতিযোগিতায়।
২০২৫ সালের এপ্রিলে বেইজিংয়ে বিশ্বের প্রথম রোবট হাফ ম্যারাথনে মানব দৌড়বিদদের পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায় হিউম্যানয়েড রোবট।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন।
প্রকৌশলীদের রোবটগুলোর পাশে দৌড়াতে হয়েছিল। প্রয়োজন হলে তাঁরা হস্তক্ষেপ করতেন। কিছু রোবট শুরুতেই পড়ে যায়। অন্যগুলো কয়েক মিটার এগিয়ে রেলিংয়ে ধাক্কা খায়।
এক বছর পর চিত্র বদলে যায়।
দ্বিতীয় বেইজিং হাফ ম্যারাথনে ইউনিট্রির ‘এইচ১’ রোবট কোনো মানুষের সহায়তা ছাড়াই ফিনিশিং লাইনের দিকে ছুটে যায়।
২০২৬ সালের প্রতিযোগিতায় ১০০টির বেশি রোবট দলের মধ্যে ৪৭টি দল দৌড় শেষ করেছে, জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি প্রযুক্তিগত পরিপক্বতার একটি ইঙ্গিত।
‘ফ্ল্যাশ’ এবং মানবদেহের গতির অনুকরণ
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল চীনের স্মার্টফোন নির্মাতা অনারের তৈরি ‘ফ্ল্যাশ’ নামের হিউম্যানয়েড রোবটের পারফরম্যান্স।
রোবটটি নিজে নিজেই ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে হাফ ম্যারাথন শেষ করে। এর সময়টি ওই সময়ের মানব বিশ্ব রেকর্ডের চেয়েও প্রায় সাত মিনিট কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হিউম্যানয়েড রোবটের জন্য দৌড়ানো অত্যন্ত জটিল।
একটি মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবেই ভারসাম্য রক্ষা করে। রোবটকে সেই ভারসাম্য অর্জন করতে হয় সেন্সর, সফটওয়্যার, মোটর, অ্যাকচুয়েটর এবং নিয়ন্ত্রণ অ্যালগরিদমের সমন্বয়ে।
প্রতিটি পদক্ষেপই এক ধরনের ক্ষুদ্র গণনামূলক সিদ্ধান্ত।
সরকারের সহায়তা
চীনের এই অগ্রগতি শুধু বাজারের প্রতিযোগিতার ফল নয়।
রোবোটিকস খাত নিয়ে বেইজিংয়ের ২০২১ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ভর্তুকি, গবেষণায় করছাড় ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ওই পরিকল্পনায় চীনকে ‘রোবোটিকস প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বৈশ্বিক উৎস’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সরকারি নীতির সঙ্গে বিশাল উৎপাদন সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয় হয়েছে। মোটর, ব্যাটারি, সেন্সর, ক্যামেরা, প্রসেসর, ধাতব উপাদান এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের ব্যাপক উৎপাদন রোবট তৈরির ব্যয় কমাতে সহায়তা করেছে।
এখানে একটি চক্র তৈরি হয়েছে।
কম খরচে প্রোটোটাইপ তৈরি করা যায়। বেশি প্রোটোটাইপ তৈরি হলে পরীক্ষার সুযোগ বাড়ে। পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লে প্রযুক্তিগত ভুল দ্রুত শনাক্ত হয়। আর সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের যন্ত্রকে আরও উন্নত করে।
২০২৬: এবার হাতের পালা
রোবট দৌড়াতে পারে। কিন্তু মানুষের মতো কাজ করতে পারে কি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ২০২৬ সালে ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে রোবটের হাত নিয়ে একটি নতুন প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়েছে।
রোবটকে স্ক্রু শক্ত করে লাগানো, বোতল খোলা এবং চিমটি দিয়ে ছোট ছোট পুঁতি তুলে নেওয়ার মতো কাজ করতে হচ্ছে।
শুনতে সহজ।
আসলে নয়।
মানুষের হাত অসাধারণ সূক্ষ্মতার সঙ্গে শক্তি, চাপ ও গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একটি ছোট পুঁতি ধরার সময়ও মানুষ অবচেতনভাবে আঙুলের চাপ পরিবর্তন করে। রোবটের জন্য সেই দক্ষতা অর্জন করা একটি কঠিন প্রকৌশলগত সমস্যা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মানুষের মতো নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে এমন হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির ক্ষেত্রে হাত তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ কারণে কাজভিত্তিক প্রতিযোগিতার গুরুত্ব বাড়ছে।
রোবট কত দ্রুত দৌড়ায়, সেটি আকর্ষণীয়। কিন্তু কারখানায় স্ক্রু লাগাতে পারে কি না, গুদামে পণ্য ধরতে পারে কি না, কিংবা মানুষের পাশে নিরাপদে কাজ করতে পারে কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক সাফল্য নির্ধারণ করবে।
বোল্টের রেকর্ড ছাড়িয়ে রোবট
রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় গতি নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত দাবিগুলোর একটি এসেছে অনারের ‘লাইটনিং’ রোবটকে ঘিরে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, অনারের তৈরি ‘লাইটনিং’ নামের হিউম্যানয়েড রোবট ১০০ মিটার দৌড়েছে ৯ দশমিক ৩২ সেকেন্ডে।
এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় বেইজিংয়ে দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস শুরুর দিন।
এই সময় ২০০৯ সালে বার্লিনে বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে উসাইন বোল্টের করা ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ডের চেয়ে দ্রুত।
অবশ্য মানব ও রোবটের পারফরম্যান্সকে একই ক্রীড়া মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। তবু প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ কয়েক বছর আগেও হিউম্যানয়েড রোবটের জন্য সোজা হয়ে হাঁটাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
আজ তারা দৌড়াচ্ছে।
আগামী দিনে তারা হয়তো কাজও করবে।
রোবট বিপ্লবের আসল রহস্য
চীনের রোবট বিপ্লবের গল্প আসলে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গল্প নয়। এটি সরবরাহব্যবস্থা, শিল্পনীতি, প্রকৌশল শিক্ষা, সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সম্মিলিত ফল।
একসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দল ও শখের রোবট নির্মাতারা রোবট গেমসের আয়োজন করতেন। এখন সেই আয়োজন রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত জাতীয় প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।
আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এসব প্রতিযোগিতা হয়ে উঠেছে বাস্তব প্রয়োগের পরীক্ষাক্ষেত্র।
এখানে প্রোটোটাইপ শুধু প্রদর্শিত হয় না। তাকে দৌড়াতে হয়, ভারসাম্য রাখতে হয়, বস্তু ধরতে হয়, কাজ সম্পন্ন করতে হয়।
সেখানেই খেলনা প্রযুক্তি শিল্পপ্রযুক্তিতে রূপ নেয়।
চীনের সামনে এখন নতুন পরীক্ষা। শুধু দ্রুত রোবট বানানো নয়, বরং এমন রোবট তৈরি করা, যা নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং বাস্তব জীবনে কার্যকর।
এই রূপান্তর সফল হলে আজকের ‘রোবট অলিম্পিক’ আগামী দিনের শিল্পবিপ্লবের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।