শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবরবিএনপি

ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থায়নের পথ খুলেছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

TTaaraaz24bd০৯ Sep ২০২৬, ১১:০০ AM1 পাঠক0 মন্তব্য
ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থায়নের পথ খুলেছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মিজানুর রহমান এবং আইএসডিবির পক্ষে সংস্থাটির ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসি আইসামি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের এই অর্থায়ন মূলত ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণসহ আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে।

Inside Artcle

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় নতুন গতি

চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপরিশোধিত তেল শোধনাগার। দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও নানা প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বাস্তবায়নগত জটিলতায় প্রকল্পটি এগিয়েছে ধীরগতিতে। নতুন অর্থায়ন চুক্তি সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উদ্যোগকে বাস্তবায়নের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতা সম্প্রসারণের পর প্রায় ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। অর্থাৎ, সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই পরিবর্তন শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার মতো বিষয়।

পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে চাপ কমানোর লক্ষ্য

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের তুলনায় সরাসরি পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে দেশে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়বে। এর ফলে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন কমানো এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটির অন্যতম কৌশলগত উদ্দেশ্যই হলো এই নির্ভরতা হ্রাস করা।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানিতে প্রায় ২০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বার্ষিক হিসাবে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় কৌশলগত পদক্ষেপ

আধুনিক অর্থনীতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন বা পরিবহন খাতের বিষয় নয়। কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বাণিজ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

এই বাস্তবতায় ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ একটি কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দামের ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। দেশে পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি সেই ঝুঁকির একটি অংশ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

প্রকল্পটি তাই তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।

আইএসডিবির সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা

বাংলাদেশ ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহযোগিতার ইতিহাস দীর্ঘ। নতুন এই অর্থায়ন চুক্তি সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইএসডিবির অর্থায়নকে বাংলাদেশের প্রতি আস্থার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন বলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তিনি জ্বালানি খাতের পাশাপাশি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রকল্পটির গুরুত্ব তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের বাইরে ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল এবং সবুজ শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপরেখায় নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শিল্পায়নের গতি বাড়াতে হলে পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল জ্বালানি অবকাঠামো অপরিহার্য।

অর্থায়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

চুক্তি স্বাক্ষর প্রকল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এর পরবর্তী ধাপগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর প্রকল্পের নকশা, দরপত্র, নির্মাণ, প্রযুক্তি নির্বাচন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার বিষয়গুলো সামনে আসবে।

এর আগে সরকারের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণকে তুলনামূলকভাবে কঠোর অর্থায়ন শর্তসম্পন্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা, সময়ানুবর্তিতা এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হবে।

একটি বৃহৎ রিফাইনারি প্রকল্পে নির্মাণ ব্যয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রযুক্তিগত দক্ষতা, পরিচালন সক্ষমতা, নিরাপত্তা মান এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের নির্ধারক। পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে শুরু থেকেই।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব জ্বালানি খাত ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাড়তি পরিশোধন সক্ষমতা আমদানি ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

শিল্প খাতের জন্যও এর তাৎপর্য রয়েছে। স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ উৎপাদন পরিকল্পনাকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য করতে পারে। পরিবহন খাতেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ, প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।

সামনে যে প্রত্যাশা

ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণের এই অর্থায়ন চুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রকল্পটির আর্থিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছে। এখন নজর থাকবে বাস্তবায়নের গতি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং নির্ধারিত সময়ে দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের দিকে।

দেশের জ্বালানি চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি দূরদর্শী বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প বাস্তবে রূপ নিলে আমদানি নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

Sticky
Popup