বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পথচলায় যুক্ত হলো আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩৯তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র। নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের সিনেমা প্রবেশ করল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক পরিসরে। উৎসব কর্তৃপক্ষ ১ অক্টোবর ২০২৬ পূর্ণাঙ্গ লাইনআপ প্রকাশ করে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে
টোকিও চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সিনেমা
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পথচলায় যুক্ত হলো আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩৯তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র। নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের সিনেমা প্রবেশ করল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক পরিসরে। উৎসব কর্তৃপক্ষ ১ অক্টোবর ২০২৬ পূর্ণাঙ্গ লাইনআপ প্রকাশ করে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এটি শুধু একটি চলচ্চিত্রের নির্বাচনের ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সিনেমার জন্য এটি একটি সাংস্কৃতিক মাইলফলক, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক উৎসবের পরিসরে দেশের নির্মাতাদের সৃজনশীল ভাষা, গল্প বলার ধরন এবং সামাজিক বাস্তবতাকে নতুন দর্শকের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হওয়ার দিক থেকে। টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রায় চার দশকের ইতিহাসে বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র এর আগে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়নি।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর গল্প
রুবাইয়াত হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকার এক হবু কনে। বিয়েকে ঘিরে প্রস্তুতি, সৌন্দর্যচর্চা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে চরিত্রটির জীবনে তৈরি হয় এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক পরিসর।
ছবিটি নিছক বিয়ের গল্প নয়। বরং নারী শরীর, ব্যক্তিসত্তা, সৌন্দর্যের সামাজিক সংজ্ঞা, আকাঙ্ক্ষা এবং প্রচলিত বৈবাহিক কাঠামোর সঙ্গে ব্যক্তিগত ইচ্ছার সংঘাতকে চলচ্চিত্রের ভাষায় অনুসন্ধান করা হয়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্ন, ভয়, স্মৃতি এবং অলৌকিকতার উপাদান মিশিয়ে নির্মিত হয়েছে এর আখ্যান। ফলে গল্পটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামাজিক—একটি মানুষের অন্তর্গত অস্বস্তি থেকে বৃহত্তর সমাজের অনুশাসনের দিকে তার বিস্তার ঘটে।
ছবিটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর আন্তর্জাতিক যৌথ প্রযোজনা কাঠামো। বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের গল্পকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ ধরনের সহযোগিতা শুধু অর্থায়নের পরিসর বাড়ায় না, নির্মাণ-প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও চলচ্চিত্রকর্মীদের অভিজ্ঞতারও সংমিশ্রণ ঘটায়।
ভেনিস থেকে টোকিও
টোকিওতে নির্বাচিত হওয়ার আগে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ আন্তর্জাতিক উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে ইতিহাস তৈরি করেছে। ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়েছিল ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮২তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘Orizzonti’-তে। এর মাধ্যমে ভেনিসের ওই প্রতিযোগিতা বিভাগেও প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের একটি চলচ্চিত্র স্থান পেয়েছিল।
ভেনিসের পর টরন্টোসহ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিভিন্ন আয়োজনে ছবিটির উপস্থিতি বাংলাদেশের সিনেমাকে নতুন করে আলোচনায় আনে। টোকিওর মূল প্রতিযোগিতায় নির্বাচনের ফলে সেই আন্তর্জাতিক যাত্রা আরও বিস্তৃত হলো।
একটি চলচ্চিত্র যখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের প্রোগ্রামিং কাঠামোয় জায়গা করে নেয়, তখন তার সামনে কেবল দর্শকপ্রাপ্তির সুযোগই তৈরি হয় না; সমালোচক, প্রযোজক, পরিবেশক এবং চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গেও যোগাযোগের পরিধি বাড়ে। স্বাধীন ও শিল্পনির্ভর সিনেমার জন্য এ ধরনের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের গুরুত্ব
টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র আয়োজন। ২০২৬ সালের ৩৯তম আসর অনুষ্ঠিত হবে ২৬ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। উৎসবের ভেন্যুগুলো টোকিওর হিবিয়া, ইউরাকুচো, মারুনোউচি ও গিনজা এলাকায় বিস্তৃত। এবার ১০ দিনের আয়োজনে ২০০টির বেশি চলচ্চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান থাকছে।
এ বছরের উৎসবের প্রতিপাদ্য—“Connecting — Cinema Connects Us to the World Beyond”। উৎসব কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনের সময়ে সিনেমা মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। চলচ্চিত্র সংবাদে যে ঘটনাকে দূরের বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, সিনেমা সেই বাস্তবতার অন্তর্গত মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কাছে দর্শককে নিয়ে যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের একটি চলচ্চিত্রের মূল প্রতিযোগিতায় উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, নগরজীবন, পারিবারিক কাঠামো এবং নারীর অভিজ্ঞতা এবার জাপানের দর্শক ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মহলের সামনে নতুন এক ন্যারেটিভ হিসেবে হাজির হবে।
প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব
টোকিও উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্রটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে। তালিকায় এশিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নির্মাতাদের কাজ রয়েছে। ফলে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ কেবল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রভাষার একটি স্বতন্ত্র কাজ হিসেবেও মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
উৎসবের পূর্ণাঙ্গ লাইনআপে প্রতিযোগিতা বিভাগের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে—Asian Future, Nippon Cinema Now, Gala Selection, World Focus, Animation, Japanese Classics, Youth এবং Women’s Empowerment-সহ একাধিক আয়োজন।
এমন বহুমাত্রিক আয়োজনের মধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবেশ আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে দেশের সিনেমার বৈচিত্র্য তুলে ধরার সম্ভাবনা তৈরি করে।
নারী নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি
রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্রে নারীজীবনের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এও নারীর শরীর, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছার দ্বন্দ্ব গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে টোকিওর মতো আন্তর্জাতিক উৎসবে ছবিটির নির্বাচন বাংলাদেশের নারী নির্মাতাদের সৃজনশীল পরিসর নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।
চলচ্চিত্রের ভাষা এখানে প্রতিবাদের সরল উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতীক, মনস্তত্ত্ব, স্মৃতি এবং বাস্তবতার স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে একটি চরিত্রের ভেতরের টানাপোড়েনকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা রয়েছে। এই নান্দনিক পদ্ধতিই ছবিটিকে প্রচলিত সামাজিক নাট্যরীতির বাইরে একটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রভাষা দিয়েছে।
বাংলাদেশের সিনেমার জন্য নতুন সম্ভাবনা
টোকিওতে এই নির্বাচন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সম্ভাবনার নতুন জানালা খুলে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক উৎসবের প্রোগ্রামিংয়ে কোনো দেশের সিনেমা নিয়মিতভাবে উপস্থিত হলে সেই দেশের নির্মাতা ও প্রযোজকদের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যৌথ প্রযোজনা এবং নতুন দর্শকগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বাড়ে।
বিশেষ করে টোকিও উৎসবের সঙ্গে একই সময়ে TIFFCOM নামের চলচ্চিত্র ও অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্টের বাজারও অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৬ সালে এটি ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। ফলে উৎসবের শিল্প-পরিবেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ব্যবসা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রও সক্রিয় থাকবে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য তাই টোকিওর এই উপস্থিতি কেবল সম্মানজনক নির্বাচন নয়; এটি ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সংযোগের সম্ভাব্য সেতুও।
ইতিহাসের নতুন পৃষ্ঠা
বাংলাদেশি সিনেমার আন্তর্জাতিক যাত্রা নতুন নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় একের পর এক উপস্থিতি দেশের চলচ্চিত্রের বৈশ্বিক পরিচিতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। ভেনিসে ইতিহাস তৈরির পর টোকিওর মূল প্রতিযোগিতায় ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর নির্বাচন সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
২৬ অক্টোবর যখন টোকিওর প্রেক্ষাগৃহে উৎসব শুরু হবে, তখন পর্দায় শুধু একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে না। সেখানে বাংলাদেশের একটি নগরজীবন, একটি নারীর অভিজ্ঞতা এবং একটি সমাজের নানা অদৃশ্য অনুশাসনের গল্পও পৌঁছে যাবে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে।
প্রায় চার দশকের ইতিহাসে প্রথমবার টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সিনেমার উপস্থিতি তাই নিঃসন্দেহে দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। এর পরবর্তী মূল্যায়ন নির্ভর করবে দর্শক, সমালোচক এবং উৎসবের বিচারকদের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে নির্বাচনের ঘটনাটিই ইতিমধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক উৎসবের মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান করেছে।