শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবরবিজ্ঞান

মঙ্গল গ্রহের ছবিতে ‘জেলিফিশ’ অবয়ব, প্রাণের অস্তিত্বের জল্পনা

মঙ্গল গ্রহের শুষ্ক, ধুলোময় ভূদৃশ্যের একটি ছবিতে সম্প্রতি দেখা গেছে অদ্ভুত এক অবয়ব। দূর থেকে তাকালে সেটিকে অনেকটা ‘জেলিফিশ’ বা ছাতার মতো আকৃতির কোনো বস্তু বলে মনে হয়। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেউ এটিকে অজানা কোনো বস্তু হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনার সঙ্গে ঘটনাটিকে যুক্ত করছেন।

TTaaraaz24bd১৯ Aug ২০২৬, ০৭:২৩ AM0 পাঠক0 মন্তব্য
মঙ্গল গ্রহের ছবিতে ‘জেলিফিশ’ অবয়ব, প্রাণের অস্তিত্বের জল্পনা
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

মঙ্গল গ্রহের শুষ্ক, ধুলোময় ভূদৃশ্যের একটি ছবিতে সম্প্রতি দেখা গেছে অদ্ভুত এক অবয়ব। দূর থেকে তাকালে সেটিকে অনেকটা ‘জেলিফিশ’ বা ছাতার মতো আকৃতির কোনো বস্তু বলে মনে হয়। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেউ এটিকে অজানা কোনো বস্তু হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনার সঙ্গে ঘটনাটিকে যুক্ত করছেন।

তবে বিজ্ঞানীরা সাধারণত এমন দাবির ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক থাকেন। একটি অস্বাভাবিক ছবি কৌতূহল তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেটি নিজে থেকে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ হয়ে যায় না।

Inside Artcle

ছবিটি কোথা থেকে এসেছে?

আলোচিত ছবিটি নাসার কিউরিওসিটি রোভার-এর তোলা। কিউরিওসিটি ২০১২ সাল থেকে মঙ্গল গ্রহের গেইল ক্রেটার অঞ্চলে অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং মঙ্গলপৃষ্ঠের ভূতত্ত্ব, পরিবেশ ও অতীতের বাসযোগ্যতার সম্ভাবনা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে।

সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ছবিটি আসলে ২০২৩ সালের আগস্টে তোলা একটি নেভিগেশন ক্যামেরার ছবির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিউরিওসিটির নেভক্যাম নিয়মিতভাবে রোভারের চারপাশের ভূদৃশ্য ধারণ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটির একটি অংশ বড় করে দেখানোর পরই অদ্ভুত অবয়বটি মানুষের নজরে আসে।

ছবিতে যে আকৃতিটি দেখা যাচ্ছে, সেটি খুব ছোট এবং দূরবর্তী। কিন্তু ডিজিটালভাবে বড় করে দেখালে তার গঠন অনেকটা মাথার মতো অংশ এবং নিচে সরু অংশবিশিষ্ট কোনো অবয়বের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এখান থেকেই জন্ম নেয় ‘জেলিফিশ’ অবয়ব নিয়ে বিস্ময়।

প্রাণের প্রমাণ, নাকি ক্যামেরার বিভ্রান্তি?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ছবিটির অস্বাভাবিক গঠন নিয়ে অনলাইনে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনায় ক্যামেরা আর্টিফ্যাক্ট বা ইমেজিং-সংক্রান্ত ত্রুটির সম্ভাবনাও উঠে এসেছে। বিশেষ করে ছবিতে কিছু অস্বাভাবিক পিক্সেল বিন্যাস দেখা যায়, যা প্রকৃত কোনো বস্তুর চেয়ে সেন্সরে মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাব অথবা অন্য কোনো ইমেজিং সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। অনলাইন বিশ্লেষণেও একই দৃশ্যের কাছাকাছি সময়ের ছবিতে অবয়বটি অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

মহাকাশে কাজ করা ক্যামেরাগুলো পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি কঠিন পরিবেশের মুখোমুখি হয়। মহাজাগতিক রশ্মি বা উচ্চশক্তির কণিকা সেন্সরে আঘাত করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছবিতে অস্বাভাবিক পিক্সেল তৈরি হতে পারে। ফলে একটি মাত্র ফ্রেমে দেখা অদ্ভুত আকৃতিকে সরাসরি কোনো জীব বা যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়।

মানুষের চোখ কেন এমন আকৃতি খুঁজে নেয়?

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, যার নাম প্যারেইডোলিয়া। মানুষের মস্তিষ্ক অস্পষ্ট বা এলোমেলো আকৃতির মধ্যে পরিচিত কোনো বস্তু, মুখ কিংবা জীবের অবয়ব খুঁজে নিতে অত্যন্ত দক্ষ।

মেঘের মধ্যে মুখ দেখা, পাহাড়ের গায়ে মানুষের অবয়ব মনে হওয়া কিংবা পাথরের গঠনে প্রাণীর আকৃতি খুঁজে পাওয়া এর সাধারণ উদাহরণ। মঙ্গল গ্রহের ছবিতে এমন ঘটনা নতুন নয়। লাল গ্রহের ছায়া, পাথর, পাহাড় এবং বালিয়াড়ির নানা গঠন অতীতেও মানুষের কল্পনাকে উসকে দিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে কারণ অবয়বটি দেখতে অস্বাভাবিক। মানুষের মস্তিষ্ক সেই অস্পষ্ট গঠনকে একটি পরিচিত প্রাণীর সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি সাধারণ ইমেজিং অস্বাভাবিকতা পরিণত হয় মহাজাগতিক রহস্যে।

তাহলে কি মঙ্গল গ্রহে প্রাণ নেই?

এমন সিদ্ধান্তও টানা যাবে না।

মঙ্গল গ্রহে বর্তমানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সেখানে কখনো প্রাণের সম্ভাবনা ছিল না। বরং মঙ্গল নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের একটি বড় প্রশ্নই হলো, অতীতে গ্রহটির পরিবেশ কতটা বাসযোগ্য ছিল।

কিউরিওটি এবং অন্যান্য মঙ্গলযান প্রমাণ সংগ্রহ করেছে যে বহু বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলের কিছু অঞ্চলে তরল পানির উপস্থিতি ছিল। প্রাচীন নদী, হ্রদ এবং জলসম্পর্কিত ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে যে অতীতে মঙ্গলের পরিবেশ আজকের তুলনায় অনেক বেশি অনুকূল ছিল।

আর এখানেই প্রাণের অস্তিত্বের জল্পনা বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব পায়। গবেষকেরা মূলত বর্তমান মঙ্গলের পৃষ্ঠে কোনো অদ্ভুত প্রাণী খুঁজে বেড়াচ্ছেন না। তাঁরা খুঁজছেন প্রাচীন জীবনের সম্ভাব্য রাসায়নিক বা ভূতাত্ত্বিক চিহ্ন, যাকে বিজ্ঞানীরা বায়োসিগনেচার হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

কিউরিওটির ছবির চেয়ে বড় প্রশ্ন

মঙ্গলের একটি ছবিতে অদ্ভুত অবয়ব দেখা যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, রোবটিক মিশনগুলো কীভাবে প্রমাণ যাচাই করে।

একটি সম্ভাব্য আবিষ্কারকে বিশ্বাসযোগ্য করতে সাধারণত একাধিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হয়। একই বস্তু বিভিন্ন ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে কি না, পরবর্তী ছবিতে সেটি রয়েছে কি না, তার ছায়া ও অবস্থান বাস্তব ভূদৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং বস্তুটির রাসায়নিক বা ভৌত বৈশিষ্ট্য কী, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

একটি মাত্র ছবিতে কোনো আকৃতি দেখা গেলেই সেটিকে জীব বলে ঘোষণা করা যায় না। বরং সেটি গবেষণার একটি সম্ভাব্য সূত্র হতে পারে। বিজ্ঞান তখন শুরু হয় প্রশ্ন দিয়ে, সিদ্ধান্ত দিয়ে নয়।

মঙ্গল নিয়ে রহস্য কেন এত আকর্ষণীয়?

মঙ্গল গ্রহ দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের কল্পনার কেন্দ্রে। পৃথিবীর বাইরে তুলনামূলকভাবে কাছের এই গ্রহটির সঙ্গে আমাদের মিল যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বিপুল বৈপরীত্য। সেখানে একসময় পানি প্রবাহিত হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু আজকের পৃষ্ঠ অত্যন্ত শীতল, শুষ্ক এবং বিকিরণপ্রবণ।

এই বৈপরীত্যই মঙ্গলকে মহাকাশ গবেষণার একটি অনন্য পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে।

একটি ছোট পাথর, অদ্ভুত ছায়া কিংবা ক্যামেরার ত্রুটি তাই সহজেই বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। ‘জেলিফিশ’ আকৃতির এই ছবিও তার ব্যতিক্রম নয়।

শেষ কথা

মঙ্গল গ্রহের ছবিতে অদ্ভুত ‘জেলিফিশ’ অবয়ব দেখা গেছে, এটি সত্য। ছবিটি নাসার কিউরিওটি রোভারের ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটিকে মঙ্গল গ্রহের প্রাণ, এলিয়েন বা কোনো জীবন্ত সত্তার প্রমাণ বলার মতো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

বরং ক্যামেরা আর্টিফ্যাক্ট, মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাব, পিক্সেল-সংক্রান্ত অস্বাভাবিকতা অথবা দৃষ্টিভ্রমের মতো ব্যাখ্যাগুলো আগে বিবেচনা করা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

তবু ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে। এটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, মঙ্গল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ। একটি রহস্যময় ছবি হয়তো প্রাণের প্রমাণ নয়, কিন্তু সেটি প্রশ্ন করার আগ্রহকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

আর মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক বড় আবিষ্কারের শুরুই হয়েছে একটি ছোট প্রশ্ন থেকে।

n.

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

sticky add
Popup
মঙ্গল গ্রহের ছবিতে ‘জেলিফিশ’ অবয়ব, প্রাণের অস্তিত্বের জল্পনা | তারাজ২৪