রংপুর প্রতিনিধি | Taaraaz24
বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে রংপুর অঞ্চলের আবহাওয়া
বর্ষাকাল চললেও রংপুর বিভাগে বইছে মৃদু তাপপ্রবাহ। জলবায়ু পরিবর্তন, কম বৃষ্টিপাত এবং বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। বিস্তারিত পড়ুন।

বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কথা থাকলেও রংপুর বিভাগে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের স্বল্পস্থায়ী বৃষ্টির পর আবারও বেড়েছে তাপমাত্রা। মৃদু তাপপ্রবাহ, আর্দ্রতা এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট মিলিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণেই বর্ষাকালের স্বাভাবিক আবহাওয়ার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
রংপুর বিভাগে বাড়ছে তাপমাত্রা
রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (৪ জুলাই) বিকেলে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রেকর্ড করা হয়েছে। এর ফলে রংপুর বিভাগের একাধিক জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বিরাজ করছে।
উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে দিনের বেলায় বাইরে বের হওয়া মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘরের বাইরে যেতে চাইছেন না।
গরমে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
অস্বাভাবিক গরমের প্রভাবে জ্বর, সর্দি-কাশি, পানিশূন্যতা এবং অন্যান্য মৌসুমি অসুস্থতার প্রকোপও বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে গরমজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
পরিবেশবিদদের মতে, উত্তরাঞ্চলের আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। বছরের বিভিন্ন সময়ে ঋতুচক্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তাদের মতে—
বর্ষায় বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে, গ্রীষ্মে তাপমাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, শীতে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগের তুলনায় আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
এ ধরনের পরিবর্তন কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
নদীর পানি কমে যাওয়ায় বাড়ছে সংকট
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেন, উত্তরাঞ্চলের বহু নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নদীর পানির পরিমাণ হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রবণতা কৃষি উৎপাদনের ওপরও প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণ উভয় ক্ষেত্রেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
লোডশেডিংয়ে বেড়েছে জনদুর্ভোগ
তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন।
বিশেষ করে হাসপাতালের রোগী, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীও পড়াশোনায় সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহে ব্যবধান
বিদ্যুৎ বিতরণ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রংপুর বিভাগে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই ঘাটতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত সময়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বৃষ্টির সম্ভাবনায় স্বস্তির আশা
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কিছুটা কমে এসে জনজীবনে স্বস্তি ফিরতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাময়িক বৃষ্টিপাত পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি করলেও জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় পরিবেশ সংরক্ষণ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর আরও জোর দিতে হবে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান




