শ্রমজীবী ও ছিন্নমূল মানুষের কথা চিন্তা করে পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের আয়োজন করেছিলেন কয়েকজন তরুণ। এখন দরিদ্র নারী-পুরুষের সঙ্গে শিশুরাও এই ইফতারি পাচ্ছে। প্রতিদিন ২০০ মানুষের ইফতারের আয়োজন করছেন এই তরুণেরা।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরে সাত বছর ধরে রমজান মাসে এই ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে। ‘সোশ্যাল চ্যারিটি ফাউন্ডেশন’ নামে তরুণদের একটি সামাজিক সংগঠন আছে। এই সংগঠনের ব্যানারে এই আয়োজন করা হয়।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের কবি মমিনুল মউজদীন সড়কের এক পাশে বিকেল হলেই মানুষের ভিড় বাড়ে। আসরের নামাজের পরই শ্রমজীবী ও ছিন্নমূল মানুষ জড়ো হতে থাকেন সেখানে। পুরুষদের সঙ্গে আসেন শিশু ও নারীরাও। তাঁরা নিজেরাই সারবদ্ধভাবে দাঁড়ান। এরপর তাঁদের হাতে ইফতারির প্যাকেট তুলে দেওয়া হয়।
এই উদ্যোগের সমন্বয় করেন আয়োজক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তরুণ সমাজকর্মী নাসিম চৌধুরী। এর জন্য নিজেরা যেমন অর্থ দেন, তেমনি তাঁদের এই মহতি উদ্যোগে অর্থ দিয়ে পাশে থাকেন দেশ-বিদেশের অনেক শুভানুধ্যায়ী। প্রতিদিন ২০০ জনের ইফতারির জন্য ব্যয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। ইফতারির প্যাকেটে পোলাও, ডিম, খেজুর, পেঁয়াজু ও ছোলা থাকে।
গতকাল বুধবার বিকেলে ইফতারি বিতরণের সময় কথা হয় শহরের হাছননগর এলাকার রিকশাচালক আবদুল মনাফের (৫৫) সঙ্গে। তিনি চার বছর ধরে প্রতি রমজানে এখানে ইফতার করেন। বিকেলে শহরের যে প্রান্তেই থাকেন, চলে আসেন এখানে। ইফতারের পর আবার রিকশা চালান। আবদুল মনাফ বলেন, ‘শুধু আমি না, অনেকেই আয়। গরিব মানুষের জন্য বড় উপকার অয়। যারা ইফতারি দেইন, আমরা তারার লাগি দোয়া করি।’
সদর উপজেলার হাছনবাহার এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত আলী (২৯) দিনমজুরের কাজ করেন। প্রতিদিন সকালে শহরে কাজে আসেন। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এখান থেকে ইফতারি নিয়ে যান। সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা স্বরুফা বেগম (৪০) এসেছেন সঙ্গে দুই শিশু নিয়ে। জানালেন শিশু দুটি তাঁর প্রতিবেশী। তিনজনই এখান থেকে প্রতিদিন ইফতারি নেন।
জানা গেল, শুধু ইফতারি নয়, বন্যা, করোনাসহ নানা সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এই তরুণেরা।
নাসিম চৌধুরী জানান, ২০১১ সালের কথা। প্রথমে বন্ধুরা মিলে এক ঈদে চিন্তা করেন একবেলা সুবিধাবঞ্চিত ও হতদরিদ্র কিছু মানুষকে খাবার দেবেন। তখন সবাই শিক্ষার্থী। নিজেদের সঞ্চয় ও পরিবারের কাজ থেকে টাকা নিয়ে ওই বছর কিছু মানুষকে একবেলা খাবার দেওয়ার কাজটি করেন তাঁরা। এতে অভিভাবকেরা উৎসাহ দেন। এরপর প্রতিবছর কাজটি করতে থাকেন। ২০২০ সালে করোনার সময়ে যখন লকডাউন শুরু হয়, মানুষ তখন বিপাকে পড়েন। তখন কী করা যায়, ভাবেন তাঁরা। শুরু করেন খাবার বিতরণ।
নিজেরা রান্না করে একটা নির্ধারিত সময়ে খাবার বিতরণ করতে থাকেন। এই উদ্যোগে অনেকেই তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন। ওই বছর থেকেই ইফতারি বিতরণের কাজটিও শুরু করেন তাঁরা। শুরুতে নিজেরা রান্না করতেন। এখন পরিসর বড় হওয়ায় একজন বাবুর্চি আছে, তবে রান্নার পর বাকি কাজ তাঁরা নিজেরাই করেন।