বাংলাদেশের কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী।
রোহিঙ্গা সংকট: এক দশকেও মেলেনি সমাধান, কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা
বাংলাদেশের কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা এই মানুষগুলো এক দশক পরেও না পাচ্ছেন নিজ দেশে ফেরার সুযোগ, না পাচ্ছেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। বরং দিন যত যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ও অর্থায়ন ততই কমে আসছে — যা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
অনিশ্চয়তায় লাখো জীবন
রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর জীবিকার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ২৩ শতাংশ শরণার্থী পরিবার 'কাজের বিনিময়ে অর্থ' কর্মসূচির আওতায় কিছুটা আয় করতে পেরেছে। এটিই তাদের জন্য অনুমোদিত একমাত্র আনুষ্ঠানিক জীবিকামূলক কার্যক্রম। বাকিদের মধ্যে ৪২ শতাংশ পরিবারের আয় অস্থায়ী ও অনিয়মিত, আর ৩৫ শতাংশ পরিবার সম্পূর্ণ আয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে নতুন আগমনকারীদের কারণে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত তীব্র হওয়ায় নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। ক্যাম্পগুলোতে জায়গার তীব্র সংকটের কারণে এই নতুন আগমনকারীদের অনেকেই এখনো মাথার উপর ছাদ পাননি।
তহবিল সংকটের সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছেন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষেরা — নারী, কিশোরী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বয়স্করা। তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও সেবা কার্যক্রম অর্থের অভাবে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
নতুন পরিকল্পনা, পুরনো সংকট
এই পরিস্থিতিতে গত ২০ মে জাতিসংঘ যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) ২০২৬ সালের হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশ করেছে। এই পরিকল্পনায় শরণার্থী ও স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী মিলিয়ে ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য প্রয়োজন ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। অর্থাৎ জাতিসংঘ এবার কোনো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নয়, বরং কেবল জীবন রক্ষার জন্য ন্যূনতম যা দরকার তার ভিত্তিতেই বাজেট তৈরি করেছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই আবেদনের ৬০ শতাংশ অর্থায়ন ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।
নতুন এই অর্থায়নের একটি অংশ দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির মতো খাতে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেসব খাতে এতদিন অর্থ বরাদ্দ করা সম্ভব হয়নি।
ফিনল্যান্ডের সহায়তার হাত
এই সংকটময় মুহূর্তে মানবিক সহায়তায় এগিয়ে এসেছে ফিনল্যান্ড। দেশটির সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য ২০ লাখ ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। জীবন রক্ষাকারী কার্যক্রম ও সুরক্ষা সেবা অব্যাহত রাখতে সরাসরি ইউএনএইচসিআরকে এই অনুদান দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি ২০২৬ সালে ইউএনএইচসিআরের মূল তহবিলে আরও ৭০ লাখ ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফিনল্যান্ড।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন এই সহায়তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নতুন করে সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছে, তখন ফিনল্যান্ডের এই বর্ধিত অঙ্গীকার তাদের মানবিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সংকট নাজুক পর্যায়ে
ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি সতর্ক করে দিয়েছেন যে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার প্রচেষ্টা এখন একটি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। একদিকে তহবিল কমছে, অন্যদিকে ক্যাম্পের পরিবেশের অবনতি হচ্ছে এবং সুরক্ষা ঝুঁকি বাড়ছে। সেইসাথে মিয়ানমারের চলমান অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ শরণার্থীদের স্বদেশে ফেরার সম্ভাবনাকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শরণার্থীদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা জরুরি। একইসাথে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষগুলোকে সব কার্যক্রমের কেন্দ্রে রাখতে হবে এবং এই সংকট যেন বিশ্বের দৃষ্টি থেকে আড়াল না হয়ে পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ইউএনএইচসিআর স্পষ্ট করে বলেছে, মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই শরণার্থীদের পাশে থাকতে হবে। শুধু বেঁচে থাকার নয়, মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিটি রোহিঙ্গার রয়েছে — এই বোধটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে জাগ্রত রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।